Friday, May 24, 2013

ভারতবর্ষ


রাজা দুষ্মন্ত  শকুন্তলার পুত্র চন্দ্রবংশীয় রাজা ভরত। তার জন্ম কণ্বমুনির আশ্রমে। রাজত্ব লাভের পর সে সকল রাজাকে কে পরাজিত করে। এক পর্যায়ে পুরো ভারতবর্ষ তার শাসনাধীন হয়। বিদর্ভরাজের তিন কন্যার সঙ্গে এর বিয়ে হয়। এরই নামানুসারেভারতবর্ষের নামাকরণ হয়েছিল বলে কথিত আছে। কুরু এর নবম বংশধর।
পুরাণকালে পৃথিবীর সাতটি দ্বীপ ছিল। এখন যেগুলোকে মহাদেশ বলা হয়।
এখনকার নামগুলো সবাই জানে, বরং সেইকালের নাম গুলো জেনে নেওয়া যাক

সেগুলো হলো:-
১। জম্বু
২। প্লক্ষ
৩।শাল্মলী
৪। কুশ
৫। ক্রৌঞ্চ
৬। শাক
৭। পুস্কর
মোটামুটি ভাবে, যেটা বলা যায়, সেটা হল :-
১.জম্বুঃ ভারত, তিব্বত ও চীন অঞ্চল
২.শাকঃ পারস্য ও ইরাক অঞ্চল
৩.কুশঃ আফ্রিকা অঞ্চল
৪.ক্রৌঞ্চঃ ইউনান বা গ্রীস
৫.প্লক্ষ:- আ্যমেরিকা ও ব্রিটিশ অঞ্চল
৬.পুষ্করঃ স্পেন ও ইতালী অঞ্চল
৭. শাল্মলী বা শম্ভুলঃ আরব অঞ্চল।
 ভারত ছিল জম্বুদ্বীপের অন্তর্গত। এই জম্বুদ্বীপের ছিল নয়টি ভাগ। নয় ভাগকে বলে বর্ষ

তাই এই দেশের নাম হল- ভারতবর্ষ।
বর্ষগুলো কি কি ছিল ?  বর্ষ বা অংশের নাম নিয়ে পাঠান্তর আছে । তাই একে একে সবগুলোই দিচ্ছি :-
প্রথম পাঠ :-
ভারতবর্ষ
কিং- পুরুষবর্ষ

হরিবর্ষ
রুমণ্মকবর্ষ
হিরণ্ময়বর্ষ
কুরুবর্ষ
ইলাবৃতবর্ষ
ভদ্রাশ্ববর্ষ
কেতুমালবর্ষ

পাঠান্তর :-
কেতুমালবর্ষ
কিংপুরুষবর্ষ
উত্তর কুরু বর্ষ
হরিবর্ষ
হিরণ্ময়বর্ষ
রম্যকবর্ষ
ইলাবৃতবর্ষ
ভদ্রাশ্ববর্ষ
ভারতবর্ষ

এই দুটোর মধ্যে খুব যে একটা পার্থক্য আছে, তা নয়। তবে, ক্রম এবং দুটো নামের তফাৎ আছে ।
বর্তমানে যে ভুখণ্ডকে আমরা ভারতবর্ষ বলে জানি, সেটা হলো-ইলাবৃতবর্ষ আর ভদ্রাশ্ববর্ষের সীমানা ।
আরও একটা মত:-
জম্বু দ্বীপ :- কৈলাস পর্বত কে কেন্দ্র করে একটা অঞ্চল।
শাকঃ গুল মোহর গাছ (সাদা বাংলায় কৃষ্ণ চূড়া) যে অঞ্চলে বেশি হয় । বলা আছে “ইহা জম্বু দ্বীপ এর পূর্বে অবস্থিত,এটা রাজস্থান, এখনকার পাকিস্থান থেকেশুরু করে, দক্ষিণ আফগানিস্থান পর্যন্ত একটা অঞ্চল।
পুস্করঃ বলা আছে শাক এর পূর্বে , প্রচুর পদ্ম জন্মায় , প্রচুর হ্রদ আছে আর গান্ধার অঞ্চল , মানে দাড়ায় কাশ্মীর আর তার উত্তরের কোন অঞ্চল।
ক্রৌঞ্চ:- এটা তে বলা আছে প্রচুর পাখি , হংস জাতীয় পাখি , আর পুস্করের পিছনে মানে সাইবেরিয়া

কুশঃ বলা আছে ক্রৌঞ্চ এর ডান দিকে। কুশ মানে কুশ ঘাশ ও হয় আবার হিন্দু কুশ ও হয় । হিন্দু কুশ মানে হিন্দু ঘাতক ! এটা হিন্ধুকুশ পর্বত মালা আর তার ডান দিকে মঙ্গোলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল।
শাল্মলি :- এটা কুশ এর ডান দিকে । যেখানে প্রচুর শাল্মলি বৃক্ষ জন্মায় ।। অর্থাৎ তুঁত গাছ আর তুঁত মানেই রেশম সিল্ক আর রেশম সিল্ক মানে , চীন ।
প্লক্ষ :- এটা আরও ডান দিকে ,যেখানে প্রচুর পেট মোটা অলস মানুসের বাস ছিল ।
তথ্য সূত্র :- History of Ancient India: From 7300 BC to 4250 BC
By J.P. Mittal
আমাদের কোনো লিখিত ইতিহাস নেই।
ভারত বর্ষে আর্যদের আগমন ও বিজয়ের ইতিহাসকে “যদি” প্রাচীন ইতিহাসের শুরু ধরা হয়, তা হলে আর্যদের আগমন কাল খ্রীষ্টপূর্ব ১০০০ থেকে ১৫০০ বছর ধরা যেতে পারে। আর্যদের ধর্মগ্রন্থ বেদ, রামায়ন, মহাভারত, পুরান ইত্যাদি নামে অভিহিত। এসব ধর্মগ্রন্থের ঐতিহাসিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন আছে । হিন্দু ধর্ম ও হিন্দু জাতির ইতিহাস পৌরাণিক কাহিনি তে নির্মিত হয়েছে এবং আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের যুগেও তা অব্যাহত আছে। মহাভারতের আদি পর্বে পুন্ড্র দেশ ও জাতির নাম উল্লেখ আছে। এই পুন্ড্রজাতি ঐতিহ্যের ভিত্তি। পুন্ড্র একটা দেশ, একটা জাতি এবং একটি স্থানের নাম,ইতিহাসের একটি মাইলফলক।
ভুলে যাওয়া আর মুছে ফেলার কালচার আমাদের চিরন্তন। বিস্মৃতির জাতি হিসেবে আমাদের অবস্থান সম্ভবত সর্ব শীর্ষে। আর এই ভুলে যাওয়া কিংবা মুছে ফেলার পরিণামে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে আমাদের ইতিহাসের বিরাট একটি অংশ। যা আমাদের সম্পদ কিংবা সম্পত্তি।
HISTORY শব্দটার উৎপত্তি- বহু হাজার বছর আগের গ্রীক শব্দ-HISTOR থেকে। এর অর্থ:- ‘knowledge and judgment'
সোজা বাংলায়- জ্ঞান এবং বিচার! পরে ল্যাটিন শব্দ 'historia' এতে আরও একটি অর্থ যোগ করে যার অর্থ:-
বর্ণণ বা Narration
আমাদের দুর্ভাগ্য- গ্রীকদের মত আমাদের কোনো হেরোডোটাস ছিল না! খুব পুরোনো যে ইতিহাস আমরা পাই- তা হলো, কল্হনের রাজতরঙ্গিনীতাই, রামায়ণ আর মহাভারত আমাদের একটা সময়ের ইতিহাস! সেরকমই, বিভিন্ন পুরাণ, তন্ত্র প্রভৃতি হচ্ছে ইতিহাস। এই ইতিহাস আবার Rewrite করা হয়েছিল:- দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলে। ফলে,অনেক তথ্য ইচ্ছাকৃত ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
সংস্কৃত শ্লোকের ব্যাখ্যা অনেকরকম হয়। যদি , সেই ভাষাটা কারও যদি ভালো ভাবে না জানা থাকে, তবে অনেক রকমের অর্থ বের হয়।
একজন ঐতিহাসিক তো স্বাভাবিক ভাবে, এই সব শ্লোকের ওপরই নির্ভর করবেন!
আমাদের এই ভারত, মূলত তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। ভাগের নাম গুলো হল:- বিষ্ণুক্রান্তা, অশ্বক্রান্তা বা গজক্রান্তা আর রথক্রান্তা। এ গুলো প্রত্যেকটার আবার তিনটে করে ভাগ ছিল। মোট- নয় ভাগ। নয় ভাগকে বলে- বর্ষ ( সংস্কৃত শব্দ)। তাই আমাদের দেশের নাম ভারত বর্ষ। শক্তি মঙ্গল তন্ত্রানুসারে সুদূর অতীতে বিন্ধ্যাচল থেকে বাংলাদেশের চট্টলভূমি পর্যন্ত প্রদেশ বিষ্ণুক্রান্তা নামে বিখ্যাত । এই ক্রান্তায় সর্বমোট ৬৪ খানি তন্ত্র প্রচলিত ছিল। পাল রাজাদের সময়ে সমগ্র বাংলায় (পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ) তন্ত্রের বিপুল প্রভাব ছিল। তন্ত্রে উল্লেখ আছে, ‘গৌড়ে প্রকাশিত বিদ্যাগৌড়ে তন্ত্রবিদ্যায় উদ্ভব হয়। পরে এই তন্ত্রবিদ্যা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে।

অন্য পরে কা কথা। আমি একটা পুরোনো কবিতা তুলে ধরছি।

পদ্মাবতী

আলাওল
সিংহল-দ্বীপ বর্ণন-খণ্ড
কাব্য কমল সুগন্ধি ভরিপুর।
দূরেত নিকট ভাব নিকটেত দূর।।
নিকটেত দূর যেন পুষ্পেত কন্টিকা।
দূরেত নিকট মধু মাঝে পিপীলিকা।।
বনখণ্ডে থাকে অলি কমলেত বশ।
নিকটে থাকিয়া ভেকে না জান এ রস।।
এহি সূত্রে কমি মহাম্মদ করি ভক্তি।
স্থানে স্থানে প্রকাশিমু নিজ নে উক্তি।।
সিংহল দ্বীপের কথা শুন এবে গাম।
সেই পদ্মিনীর রূপ বর্ণ অনুপাম।
সরস বর্ণনা যেন উজাল দর্পণ।
যাহান যেমন রূপ দেখিব তেমন।।
ধন্য সেই দ্বীপ যথা হেন রূপ নারী
রূপে গুণে বহু যত্নে বিধি অবতারী।।
সপ্তদ্বীপ পৃথিবীর কহে সব নর।
কোন দ্বীপ নহে সিংহলের সমসর।।
দিয়া দ্বীপ সরন্দ্বীপ জন্তু দ্বীপ লঙ্কা।
কুম্ভস্থল মধুস্থল মনে করি শঙ্কা।
হন্দুস্থানী ভাষে দ্বীপ নাম এহি বলি।
জম্বু দ্বীপ প্লক্ষ আর শাক শাল্মলী।।
কুশ দ্বীপ ক্রৌঞ্চ দ্বীপ ষষ্ঠম কহিল।
পুষ্কর দরিয়া দ্বীপ সপ্তমে পুরিল।

আরও আছে! বাহুল্য হেতু আর দিলাম না। এটা পড়তেই অনেকের ধৈর্য্যচ্যুতি হতে পারে। কারণটা আর কিছুই নয়, সফট কপি এভাবে পড়া খুব কঠিন ব্যাপার। এই কবিতার পুরোনো বানান অপরিবর্তিত। আমারও অনেক জানার আছে, আর আমিই শেষ কথা নই।
পরিশেষে বলি, আমার উৎস:- শক্তিসঙ্গম তন্ত্র, বৃহৎতন্ত্রসার, গন্ধর্বতন্ত্র প্রভৃতি।

আরও একটা কথা লিখতে ভুলে গেছি। আমি সামান্য কিছু বই পড়েছি এবং আরও পড়ছি। পড়ার পর, যে সব তথ্য সব বইতে কমনহিসেবে পেয়েছি, সেগুলোই লিখেছি।
শুধু একটা বইয়ের রেফারেন্স দিলে মনে হয় ঠিক হবে না। তাই আমি কিছু বইয়ের কথা লিখেছি।

1 comment:

Unknown said...

খুব সমৃদ্ধ লেখা। বর্ষ ও দ্বীপ সংক্রান্ত একটা বেশ পরিস্কার ধারণা পাওয়া গেল।
তবে সাতটি দ্বীপের অবস্থান সংক্রান্ত প্রথম মতটি মনে হল সে যুগের সাপেক্ষে একটু far fetched. আর দ্বিতীয় মতটি ততটা পরিস্কার ধারণা দিতে অক্ষম। তবে সেযুগের সাপেক্ষে এই দ্বিতীয়টিই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হল।
নয়টি বর্ষের অবস্থান সংক্রান্ত আরেকটু বিস্তারিত জ্ঞানের চাহিদা রয়ে গেল।