Tuesday, August 5, 2014

টেলিফোন


=======

একটা সময়
, এই টেলিফোন অনেক বাড়ীতেই ষ্টেটাস সিম্বল ছিল । পাড়াতে বড় জোর একটা, খুব বেশী হলে দুটো টেলিফোন বাড়ীথাকতো ।
আপ্লাই করে দশ বছর পরে লাইন এসেছে বাড়ীতে- এটাও দেখেছি । অবশ্য, যদি কারও এমপি জানাশোনা থাকতো বা কেউ যদি এশেনসিয়াল গভরমেন্ট চাকরী করতেন- তাঁদের বেলা এই দেরিটা হতো না ।

এঁদের টেলিফোন নম্বর আমরা দিয়ে রাখতাম, বিভিন্ন বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজনের কাছে ।
যাঁদের টেলিফোন, তাঁরা কিন্তু একটুও বিরক্ত হতেন না, আমাদের টেলিফোন এলে । রাত- বিরেতে কারও অসুস্থ হবার খবর পেলে, তাঁরা যুদ্ধ তৎপরতায় সেটা পৌঁছে দিতেন যাদের দরকার, তাদের কাছে ।
তখন কিন্তু এই তিন মিনিটের সময় সীমা ছিল না । তাই যতক্ষণ খুশী কথা বলা যেত।
আবার মুশকিলও ছিল ।
ধরুন আপনি অমিতকে ফোন করবেন, চলে গেল অমিতার কাছে । সে এক বিরাট লাফড়া ।
বা, ধরুন কথা বলছেন কারও সাথে, অন্য কেউ ঢুকে পড়লেন লাইনে । তখন শুরু হত ক্যাওড়ামী ।
কখনও সেই ক্যাওরামী থেকে জন্ম নিত প্রেম, এক অদেখা যুবক যুবতীর মধ্যে । দেখা করার জায়গা ঠিক হত ।
ঘনিষ্ঠ হতে হতে বিয়ে- ছেলে- পিলে- ক্যাঁথা, ফিডিং বোতল, গ্ল্যাক্সো বেবী ফুড সব মিলিয়ে এক উপাদেয় রান্না ।
বঙ্কিমী ভাষায় :- ওহো কি হেরিলাম, জন্ম- জন্মান্তরেও ভুলিব না !!!
দূরের জন্য ট্রাঙ্ক কল বুক করে বসে থাকতো লোকজন । লাইটনিং কল ছিল । আটগুণ বেশী পয়সা দিয়ে সেই কল সাথে সাথেই পাওয়া যেত ।
আবার ছিল- পিপি । মানে পার্টিকুলার পারসন । নাম বলে দিতে হতো যাকে চাইবেন, তার কথা । সে না থাকলে, আর কল ম্যাচিওর করতো না ।

কত যে নাটক, সিনেমা, গল্প, উপন্যাস লেখা হয়েছে সেই সময়ে, সেটা সমঝদার মানুষ মাত্রেই জানেন ।


আর ছিল
 ম্যানুয়াল টেলিফোন এক্সচেঞ্জ । আগে শিল্পক্ষেত্রে মহিলাদের নাইট ডিউটি করানো নিষিদ্ধ ছিল । ব্যতিক্রম ছিলো হাসপাতাল(ডাক্তার ও নার্স) এবং এই ম্যানুয়াল টেলিফোন এক্সচেঞ্জের মহিলা অপারেটর । ক্রস কানেকশন হয়ে প্রেমের ঘটনা খুবই অল্প , কিন্তু এই ম্যানুয়াল টেলিফোন এক্সচেঞ্জের মহিলা অপারেটরদের সঙ্গে প্রেমে পড়ার ঘটনা ভুরি ভুরি ঘটতো সারা পৃথিবীতেই । এই নিয়ে প্রচুর গল্প-উপন্যাস-সিনেমা হয়ে গেছে অনেক । আমাদের কলকাতায় আগে মহিলা টেলিফোন অপারেটর মানেই ছিল এ্যাঙ্গলো ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের । ওদের সেই মৌরসি পাট্টায় প্রথম ধাক্কা আসে দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে অসংখ্য ছিন্নমূল উদ্বাস্তু পরিবারের মেয়েরা পেটের দায়ে এই (নাইট ডিউটি ওয়ালা) চাকরি নিতে বাধ্য হওয়ার কারনে । তার আগে এদেশি মেয়েরা চাকরিই প্রায় করতো না , সামাজিক বাধার কারনে । বাঙাল মেয়েরা নার্স ও টেলিফোন অপারেটরের চাকরি করতে শুরু করায় ও এদেশি ছেলেদের সঙ্গে চাকরিসূত্রে প্রচুর মেলামেশার কারনে ব্যাপক প্রেম-পরিনয় সুরু হয়ে যাওয়ায় এদেশি গোঁড়া লোকেদের মধ্যে গেল গেল রব উঠে গেছিলো । বাংলা গল্প-উপন্যাসে-সিনেমায় অল্প হলে তার প্রতিফলনও হয়েছিলো ।
কারিগরী বদলালো । এলো  এসটিডি । সাবস্ক্রাইবার ট্রাংক ডায়ালিং । আর কারও দ্বারস্থ হতে হতো না । যে শহরে ফোন করবেন, তার একটা কোড আছে । যে নম্বর চাইবেন তার আগে ওই কোড বসালেই কেল্লা ফতে !
মিনিটের আর হিসেব থাকতো না ! দিল্লিতে ছুটির দিনে খিচুড়ী বসিয়ে মেয়ে , কোলকাতায় মাকে জানাতো, আর মাও সব কাজ ফেলে মেয়েকে নির্দেশ দিতেন কিভাবে করতে হবে ।
এদিকে বিল চড়চড় করে উঠেই চলেছে, আর জামাই বাবাজীবন কপাল ঠুকছে দেওয়ালে ।
সেই সময়ে রব উঠলোএসটিডি , যৌন রোগের নাম । বিশুদ্ধ বাদীরা রে রে করে তেড়ে গেলে নাম পাল্টে হলো এন.এস.ডি । ন্যাশনাল সাবস্ক্রাইবার ডায়ালিং ।
আন্তর্জাতিক কল হলো :- ইনটারন্যাশন্যাল সাবস্ক্রাইবার ডায়ালিং, সংক্ষেপে এন.এস. ডি ।
ব্রাত্য হলো স্বপ্নের সেই ভারী টেলিফোন । পোষাকী ভাষায় ল্যান্ড লাইন । আরও সফি নাম হলো- ডেস্কটপ ফোন ।
হা- হতোস্মি--------  ওরা সবাই বৃদ্ধ হলেন । চলো এলো সেল ফোনের যুগ । কল রেট পাল্লা দিয়ে কমে এখন সমস্ত দুনিয়া হাতে মুঠোয় ।
যাক্ গে ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে গেল এটা ।
যে কথা বলতে- এত কথা লিখলাম ।
সক্কালবেলা আমার এক বন্ধুর ফোন ।
আরম্ভ হলো---- এক মহাভারত । মেয়ে কবে গিয়েছিল আম্রিগায় পড়তে ( সবই জানা ), ওখানে কি খায় ( এটাও জানা কারণ আগেও ফোন করেছে আর মেয়েটার মুখে ছোটবেলায় টুইঙ্কল টুইঙ্কল লিটল ষ্টার শুনে কতবার যে মুগ্ধতার ভান করতে হয়েছে , বন্ধুর সামনে ), এই সব দিয়ে শুরু হলো---- রাম, দুই, তিন করে ।
গম্ভীর হয়ে বললাম:- ভ্যানতারা ছেড়ে বল, কি করতে হবে ?
বন্ধু কাঁচু মাচু গলায় বলল অনি আজ আসছে কোলকাতায় । একা যেতে ভয় করছে এয়ারপোর্টে, তুই আমার সাথে যাবি ?
========

বলুন ------এই সব কোথায় পেতাম, যদি সেল ফোন না থাকতো?
গড়ে টু নেতাজী আন্তর্জাতিক- কম কথা ?





No comments: