Tuesday, August 19, 2014

ফেসবুকে ফেসাফেসি

ইদানীং লালমোহন বাবু গড়পারের বাড়ীতে ইনটারনেট কানেক্সান নিয়েছেন । তাঁর গল্পে যাতে ভুল ভাল তথ্য ধরা না পড়ে, তাই এই সাবধানতা ।
ভরদ্বাজের দেওয়া প্রথম কাপ চা খেয়ে লালমোহন বাবু খবরের কাগজ পড়া শেষ করে, দু নম্বর কাপটা খেতে খেতে ইন্টারনেট সার্ফ করেন ।
তপসের কথাতে একটা ফেসবুক অ্যাকাউণ্টও খুলেছেন তিনি ।
জটায়ু নামটা ফেক হতে পারে ভেবে, লাল মোহন গাঙ্গুলী নাম দিয়েছেন প্রোফাইলে ।
আসল ছবিও দিয়েছেন ।
তাতেও কি নিস্তার আছে ? রসে বশে গ্রুপের সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করতেই প্রশান্ত ভট্টাচার্য বলে একজন ইনবক্সে জিজ্ঞেস করল আপনি কে মশাই ? যত্ত সব ফেকলু পার্টি !
উত্তরে লিখে ছিলেন লালমোহন বাবু------ ফেকলু থেকে টা বাদ দিন । আমি ফেলুপার্টি । মানে ফেলুদার লোক ।
আপনার আসল পরিচয় দিন, না হলে আবেদন অগ্রাহ্য হবে ।
আর মশাই, ঘনাদা সেই কবে থেকে কাশীবাসী, তার প্রোফাইল যদি রসেবশে অ্যাপ্রুভ করতে পারে, তা হলে আমার নয় কেন ?
ও সব ছাড়ুন মশায় । পরিচয়টা দিন
দাঁড়ান- ফেলুদার নম্বর দিচ্ছি, ওকে জিজ্ঞেস করুন । উনিই বলবেন আমি সত্যিই লালমোহন কিনা !
এসব ভাবতে ভাবতে হরিপদবাবু এসে তার মোবাইল দিয়ে বলল- তোপসে ফোন করেছে ।
লালমোহন বাবু ফোনটা ধরলেন ।
ওপারে তোপসে :- এই জন্যই বলি, ল্যাল্ডলাইন ছেড়ে দিয়ে ভালো করেন নি । এদিকে আপনার সেল ফোনটাও অফ্ । তাই হরিপদ বাবুকে ফোনে ধরলাম
আপনি শিগ্গির চলে আসুন আমাদের বাড়ী
লালমোহন বাবু ঘাবড়ে গিয়ে উত্তর দিলেন হ্যাঁয়েস !




+++++++++++++++
অ্যাম্বাসেডর বন্ধ হয়ে গেছে বলে, লালমোহন বাবু একটা মাটি মাটি রঙের শেভ্রলে সেল ইউভা কিনেছেন ।
এর ব্যাক গিয়ার দেওয়াটা অন্য ধরণের । টেনে তুলে দিতে হয় । হরিপদ বাবুর প্রথম প্রথম একটু অস্বস্তি হচ্ছিল, তবে এখন ধাতস্থ হয়ে গেছেন ।
রজনীকান্ত সেন লেনের বাড়ীটায় কলিং বেল দিতেই শ্রীনাথ দরজা খুলে লালমোহন বাবুর হাতে ঝোলানো একটা কেজি দুয়েকের মত ইলিশ দেখে অবাক !
হে হে হে, আমার এক পাঠকের মাছের ব্যবসা আছে । আজই সকালে দিয়ে গেছিল । ভরদ্বাজ রান্না করার আগেই ফেলু বাবুর ডাক । তাই নিয়ে এলাম সাথে করে ।
শ্রীনাথ- তুমি জমিয়ে রান্না করো দেখি ।
ইলিশ মাছটা লাল মোহন বাবুর হাত থেকে নিয়ে শ্রীনাথ কিচেনে চলে গেল ।
বসার ঘরে ঢুকতেই লাল মোহন বাবু দেখলেন---- ফেলু মিত্তির একটা ইংরেজী বই পড়ছে ।
এটা নতুন বই বুঝি ?
আর না না, ২০১৩ র ৫ই মার্চ বেরিয়েছে ।
কার লেখা?
কার নয়, কাদের বলুন !
বেশ বেশ , কাদের লেখা ?
সাইমন ডানষ্টান আর জেরার্ড উইলিয়ামস্ ।
এরা কারা ? প্রখর রুদ্রের ওদেশী এডিশান ?
ধ্যাৎ
আচ্ছা, আচ্ছা বইটার নাম কি ?
দ্য গ্রে উলফ্ হিটলারের নিস্ক্রমণ ।
শ্রী নাথ , কফি আর কাজু দিয়ে গেল ।
এই সময়ে ডোর বেল ।
ফেলুদা বলল :- নির্ঘাত কর্ণেল সায়েব এসেছেন জয়ন্তকে নিয়ে !
কি করে বুঝলে ডার্লিং ফেলু ? কর্ণেল সাহেবের প্রবেশ ।
আপনার ডোর বেল বাজানো দেখে ।

টাকে হাত বুলিয়ে মুচকী হাসলেন কর্ণেল সায়েব ।




জোব্বার পকেট থেকে চার প্যাকেট চারমিনার সিগারেট বের করলেন কর্ণেল নীলাদ্রি সরকার ।
লাল মোহন বাবু জুলজুল করে চেয়ে আছেন- কর্ণেল সাহেবের টাক আর সাদা দাড়ির দিকে ।
তোপসেকে ফিস ফিস করে জিজ্ঞেস করলেন :- ইনি কে ? হাইলি সাসপিসিয়াস !
তোপসের হেসে উত্তর :- ইনি প্রখর রুদ্রর ওল্ড এজ মডেল । খুব ফুল গাছ ভালোবাসেন ।
ফেলুদা অবাক হয়ে বলল – চারমিনার সিগারেট কোথায় পেলেন কর্ণেল সাহেব ?
কর্ণেল সাহেব  মুচকি হেসে :- আরে পার্ক ষ্ট্রিটের সেলিমের দোকান থেকে । আজকাল আর বেশী আসে না । জয়ন্ত দেখে কিনে এনেছে, তোমার জন্য । সো নাইস অফ হিম । দু প্যাকেটের বেশী দিচ্ছিল না, তবু জোর করে এনেছে জয়ন্ত ।
আপনার ফ্লাইং ডাচমান পাচ্ছেন, পাইপের জন্য ?
আর বলো না ফেলু--- কি যে কষ্ট হয়, ঠিকমত পাওয়াই যায় না আজকাল । আমার আবার তামাক না খেলে কেমন যেন সুগার কমে যায় ।
 জানেন তো ! ডেভিড স্টার জর্ডান নামে এক বায়োলজিস্ট, বলেছিলেনযে ছেলে ধূমপান করে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার কোনও প্রয়োজন নেই; কারণ, তার কোনও ভবিষ্যৎই নেই।- ফেলুদা বলল ।
সে তো বুঝতেই পারছি , তোমাকে দেখে----- মিটিমিটি হাসছেন কর্ণেল সাহেব ।
লাল মোহন বাবুর উসখুস শুরু হয়েছে । এবারে সজোরে বললেন  :-
এই বৃষ্টির দিনে কোথায় ইলিশের কথা হবে, তা নয়, যত্ত সব তামাক নিয়ে আলোচনা।

কর্ণেল  পাইপে তামাক ভরতে ভরতে জিজ্ঞাসা করলের :- ডার্লিং, ফেলু, এই ভদ্রলোকের পরিচয় ?

ফেলুদা গম্ভীর হয়ে বলল :- লালমোহন গাঙ্গুলি ওরফে জটায়ু

তোপসে বলল :- অনেকের ধারণা, কর্ণেল স্যার! আপনার চেহারা কিন্তু ফাদার দ্যতিয়েনের সঙ্গে মিলে যায় !  তা আজ কে যে আপনি খালি মাথায় ? টুপিটা কোথায় গেল ?
মুখে সান্তা ক্লজের মতো সাদা গোঁফ-দাড়ির মধ্যে একটা মুচকী হাসি কর্ণেল সাহবের। পিঠের খোলা ব্যাকপ্যাক থেকে উঁকি দিচ্ছে প্রজাপতি ধরার নেট-স্টিক, গলায় ঝুলছে বাইনোকুলার আর ক্যামেরা।
পিঠের দিকে দেখিয়ে বললেন :- ডার্লিং তোপসে, যা গরম ! টুপিটা খুলে এই ব্যাকপ্যাকে রেখেছি ।
লালমোহন বাবুর মুখটা হাঁ হয়েই আছে ।
ফেলুদা বলল :- কি, লাল মোহন বাবু, এবারে কি প্রখর রুদ্রও ব্যাকপ্যাকে এসব রাখবে না কি ?
জয়ন্ত বলল :- প্রখর রুদ্র নামটা চেনা চেনা মনে হচ্ছে !
লাল মোহন বাবু উঠে বাও করে ভুরু কুঁচকে বললেন :- স্যার, ওটা আমার তৈরি একজন গোয়েন্দা । প্রথমে রবার্ট ব্লেকের আদলে লিখতাম, তারপর ফেলুবাবুর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর, প্রখরকে ওনার আদলেই গড়েছি ।
কিন্তু ওই চরিত্র  তো সাহারায় শিহরণ, দুর্ধষ্ দুশমন, বোম্বাইয়ের বোম্বেটেতে আছে আর লেখক তো জটায়ু ।
লালমোহন বাবুর মুখে গর্বের হাসি । মিটি মিটি চোখে বললেন – আমিই সেই জটায়ু !

নীলাদ্রি সরকার লাফিয়ে :- হাউ সুইট ডার্লিং জটায়ু । আপনাকে আমার ওয়ার এক্সপিরেন্স বলবো !
 ভালো করে বুঝিয়ে বলবেন , কর্ণেল, না হলে প্রখর রুদ্র আবার পিস্তল দিয়ে ট্যাঙ্ক উড়িয়ে দেবে । -   ফেলুদার চিমটি






শ্রীনাথ এসে, মোটামোটা পাঁচ পিস ইলিশ মাছ ভাজা আর কফি রেখে গেল । লালমোহন বাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন ----- এটা আমার !!!
কর্ণেল সাহেব ভুরু কুঁচকে :-মানে ? ঐ সব গুলো ইলিশ মাছ ভাজা একা খাবেন নাকি- ডার্লিং জটায়ু ?
না না, কর্ণেল সাহেব ! লালমোহনবাবু ঐ বড় ইলিশ মাছটা এনেছিলেন । উত্তেজিত হয়ে মাঝে মাঝে এরকম বলেন । - ফেলুদার যোগ, হাসতে হাসতে ।
আপনার চিন্তা নেই লালমোহন বাবু, এনারা ভালো করেই কাঁটা বেছে খাবেন- তোপসের হো হো করে হাসি ।
হাত কচলে লাল মোহনবাবু মিইয়ে গিয়ে   বললেন :-
আমি না ইলিমোশনটা চেক করতে পারি না
কি মোশন ? কর্ণেল সাহেব বিস্মিত !
ওটা- ইলিশ আর ইমোশনের সন্ধি – ফেলুদার হাসি ।
মানে ইলিশফুলি ইওরস্---- কর্ণেল সাহেব অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন ।
============
তোপসের সেল ফোনটা বেজে উঠলো !  অর্জুনের কল !


হ্যাঁ বল রে অর্জুন !

শোন, তোপসে, আমি রজনীকান্ত সেন লেনে ঢুকে পড়েছি, এবারে কোন বাড়ীটা ফেলুদার ?

কোথায় দাঁড়িয়ে তুই ?

 সামনে একটা ষ্টেট ব্যাংকের এটিয়েম, সেখানে !

ও ! ওটার নাক বরাবর চলে আয়, যে খানে শেষ রাস্তাটা, ঠিক ডান দিকেই আমাদের বাড়ী ।

ঠিক আছে, আসছি ।
====
শ্রীনাথ ওপরে নিয়ে এলো অর্জুনকে ।

আজ উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস লেট - অর্জুন ব্যাকপ্যাকটা সোফার সাইডে রেখে বসল ।
 কর্ণেল সাহেব হাত বাড়িয়ে হ্যাণ্ডশেক করলেন অর্জুনের সাথে ।
ডার্লিং, তোমার অনেক নাম শুনেছি- অমল সোমের কাছে । কেমন আছো?
আপাতত ভালোই আছি । এই গত মাসে জলপাইগুড়ির এসি কলেজে অধ্যাপকের চাকরী জুটেছে ।
সে কি ? গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দিলে?
কি করবো বলুন ? এই মফঃস্বল শহরে আর কাজ জোটে না তেমন । দু বছর আগে পরীক্ষা দিয়েছিলাম , জুটে গেল তাই চাকরি করছি ।

বলেন কি মোয়াই ? লালমোহন বাবু অবাক !
 ষষ্ঠীচরণ একটা বিরাট টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে ঢুকলো ! ক্যাটারিংয়ে যেমনটি থাকে ।
সাথে যিনি ঢুকলেন, তাকে দেখে সবাই অবাক ! শুধু ফেলুদা মিচকি হেসে চুপ !

আরে, হালুয়ামোহন বাবু !  আপনি তো  আঙ্কেল লাগেন হামার ! আপনি ভি লাল, হামি ভি লাল, মগনলাল ! আপ সবকো নমস্কার ! কাজিন ভাই কেমোন আছো ?
তোপসে হেসে বলল – ভালো, তা আপনি কবে এলেন বেনারস থেকে ?
এই তো আজ হি এলাম বিভূতি এক্সপ্রেসে ! রুকিয়ে রুকিয়ে, একঠো ভুল হয়ে গিয়েসে হামার ! এ রাজু !‍ উ প্যাড়া কি বক্সা লা ইধর !
জী সরকার ! 
রাজু একটা বিশাল কার্ডবোর্ডের বাক্স এনে রাখল মাঝখানের টেবিলে ।

 ফেলুদা- একে সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল মগনলাল মেঘরাজের সঙ্গে ।
অর্জুনের নাম শুনেই মগনলাল লাফিয়ে উঠল ।
অর্জুন বাবু, আপনার তেরা নাম্বার বক্সা লিয়ে এসেছেন তো, নাইফ থ্রোয়িং কে লিয়ে?- মগনলালের হাসির সঙ্গে জিজ্ঞাসা !
এই অর্জুন , আপনার সেই প্রাইভেট সার্কাসের অর্জুন নয় । জলপাইগুড়িতে থাকে ।- তোপসের জবাব ।
পানের ডিব্বা খুলে একটা পান মুখে দিল মেঘরাজ ।
হামি জানে !!
তো! আপনার কাজ কর্ম কেমন চলছে? ফেলুদা জিজ্ঞাসা করল ।
আপনি তো জানেন মিঃ মিত্তর ! হামি উ সব কালা ধান্ধা ছোড়িয়ে দিয়েছে ।  মঘাই পানকা বিজিনেস । হামি তো জানে- হাপনি ঘুষ খান না ! তাই পেঢ়া লিয়ে এলাম আপনার ইমেল পেয়ে । ই পেঢ়া হামার অনেষ্ট ইনকামসে আছে । বহুত খুস মৈনে আজ ।
আমরাও খুসী ! আপনি এবার সৎ পথে চলছেন ।
উসব তো বাবা বিশওনাথজীকি কিরপা ঔর আপকা চেতাবনী ! লেকিন, হামি আজকাল, বিনা স্লিপিং পিল নিদ যাছি । বহুত শান্তি !

কর্ণেল নীলাদ্রী সরকার এতক্ষণ একমনে মগনলাল মেঘরাজের মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন ।
 মগনলাল সেটা খেয়াল করে বলল :- মিঃ মিত্তর, এই সাবের সাথে হামারা মুলকাত তো করিয়ে দিলেন লেকিন ইনকে বারে মে তো আপ কুছ নেহী বোলা ।
ফেলুদা হেসে :- তাড়া কেন মগনলালজী ! আপনাকে যখন মেইল করে এখানে এনেছি, তখন সবই ধীরে ধীরে জানতে পারবেন । নিন কফি খান । লাঞ্চ করবেন তো!

আপকি বোহোত মেহেরবানী, লেকিন হাপনি তো জানেন আমি বিশুদ্ধ্ শাকাহারী, তাই মাড়োয়ারি বাসা থেকে খেয়ে লিয় হাপনার বাড়ী এসেছি । হাপনারা খেয়ে লিন- হামি ওয়েট করছি ! কি বোলেন আঙ্কেল ? – মগনলালের জবাব ।
লালমোহনবাবু যেন এই সুযোগটার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন । লাফিয়ে বলে উঠলেন :- হ্যাঁ, সেটাই করা যাক !
===========
শ্রীনাথ সার্ভ করছে টেবিলে, তখন কর্ণেল বললেন :-
ডার্লিং ফেলু :-ফিজিওগনমি ব্যাপারটা তোমার জানা আছে নিশ্চয়ই !
হ্যাঁ কর্ণেল । মুখের চেহারা দেখে একটা লোক সম্বন্ধে বলা
একজাক্টলি । তবে, বিজ্ঞান এটাকে ডিসকার্ড করে দিয়েছে ।  যাক্, তুমি আর রিডের নাম শুনেছো ?
হ্যাঁ ! উনি প্রায় দেড়শো বছর আগে কোলকাতার ডিডেকটিভ ডিপার্টমেন্টে কাজ করেছিলেন ।
ঠিক !‍ উনি একটা বই লিখেছিলেন, নাম-Everyman his own detective !
 লেখক পরিমল গোস্বামী এটার বাংলা অনুবাদও করেছেন ।  নাম :- ইংরেজ ডিডেকটিভের চোখে প্রাচীন কোলকাতা । কোলকাতার প্রাক্তন নগরপাল তুষারদা মানে তুষার তালুকদার বইটার ভূমিকাও লিখেছিলেন,২০০৮ সালে-  ফেলুদার উত্তর !
 ( চলবে)








(চলবে)












No comments: