Friday, November 7, 2014

ওধুয়া

ওধুয়া- বলে একটা গ্রাম আছে ঝাড়খণ্ডে । জায়গাটা তখন বিহারে ছিল । পশ্চিমবঙের লাগোয়া বলতে গেলে ।
মালদার মাণিকচক বা বিহারের রাজমহল হয়ে যাওয়া যেত সেই গ্রামে ।
মায়ের বাবা তখন ওখানে ডাক্তারি করতেন, দেশ ভাগ হবার পর ।
হিন্দু, মুসলমান সবাই মিলে মিশে থাকতো । হিন্দি বাংলা দুটোই চলত কথ্য ভাষা হিসেবে।
যে বাড়ীতে থাকতাম, তার পাশ দিয়েই গঙ্গা নদীর চওড়া বুক । রাতের বেলা কান পাতলে জলের ছলাৎ ছলাৎ শোনা যেত ।
মাছ ধরার জেলে নৌকো থেকে আস্তে ভেসে আসতো সদ্য মুক্তি প্রাপ্ত ছবি নাগিনের গান মন ডোলে রে ।
কলের গানে বাজতো আরও হিন্দি গান- ৭৮ আর পি এম রেকর্ডে । একটু দূরেই ছিল একটা ভাঙা ব্রিজ ।
বলা হতো ওটা মোঘল আমলে তৈরি, রাজমহলের সাথে যোগাযোগ রাখার জন্য ।
তা, ঐ ভাঙা ব্রীজের ওপর দিয়ে নাকি ঘোড়ার খুরের আওয়াজ পাওয়া যেত গভীর রাতে । লোকের ভয় ছিল ।
মাঝে মাঝে চীৎকার হত উর্দু ভাষায় ।
ভয়ে সিঁটকে , চোখ খুলে চাইতে পারতাম না লণ্ঠনের আলোয় ভরা গঙ্গা মুখী বারান্দার দিকে । মায়ের পাশে চুপ করে শুয়ে থাকতাম । মা পাখা নেড়ে হাওয়া করতো আমায় ।
আমার মেজোমামা ছিলেন দাদুর কম্পাউণ্ডার । ওধুয়ার হাটখোলাতে সোনার দোকান ছিল ভগীরথ মামার ।
মেজোমামার হাত ধরে , ভগীরথ মামার দোকানে যেতাম ।
ভারি পয়সাওয়ালা লোক তারা । বাড়ীতে, ইয়া বড় একটা রেডিও আর চোং লাগানো কলের গান ছিল ।
বিশাল দুটো উঁচু বাঁশ দু দিকে পোঁতা । মধ্যে খানে ঝুলতো তামার পাক খাওয়া তার।
তারটা বাঁধা থাকতো দুটো শামুকের খোলের মত দেখতে সাদা পোরসিলিনের ছোট খোপ ওয়ালা জিনিসের সঙ্গে । ও দুটো আবার দড়ি দিয়ে বাঁধা, বাঁশ গুলোর সাথে ।
তামার তারের মাঝখানে জোড়া একটা কালো তার নেমে সেঁধিয়ে যেত রেডিওতে । এটার পোষাকী নাম ছিল এরিয়াল । আজকালকার অ্যান্টেনার ছোট ভাই।
বলা হতো- যত উঁচুতে থাকবে এরিয়েল- তত ভালো রিসেপশান হবে রেডিওতে ।
কত যে গান বাজনা শুনতাম ।
ছুটি ফুরিয়ে গেলে গরুর গাড়ী চেপে আসতাম মায়ের সঙ্গে রাজমহল ষ্টেশনে।
সেখান থেকে দু বার ট্রেন বদল করে ওডিশার পারলাখেমুণ্ডিতে বাবার কাছে।
মেজোমামা পৌঁছে দিয়ে একদিন বাদেই ফিরে যেতো ওধুয়ায় , না হলে একা দাদুর কষ্ট হবে ।
বাবা একবার জন্মদিনে আমায় একটা রুপোর টাকা দিয়েছিলেন- রাজার মুখ খোদাই করা ।

কোথায় যে হারিয়ে গেল সেটা ! এখন শুধু স্মৃতি সেই টাকা আর পায়েস খাওয়া

No comments: