আগে শরীর তারপর পোষাক ।
একই ভাবে আগে ভাষা তারপর ব্যকরণ ।
ভাষার শৃঙ্খলা বাংলা ভাষা কেন, সব ভাষাকেই বেঁধে রেখেছে
।
এবারে শুধু বাংলা ভাষার কথাই বলা যাক ।
=========
আপাতত বাংলা ভাষা নিয়েই লেখাটা সীমাবদ্ধ রাখি ।
একটা গোলমাল আছে , সেটা হলো ব্যাকরণ । এই ব্যাপারটাই বড্ড
ঝঞ্ছাট পাকায় । মানুষ যখন কথা বলে, তখন তো ব্যাকরণ মাথায় রাখে না । কি প্রকাশ করছে
সেটাই প্রধান ।
আমার এক সাঁওতাল বন্ধু ছিলেন । কথায় কথায় বলতেন – অসম্ভব্
। খুব বেশী উত্তেজিত হলে বলতেন – সাট্টাম্ ।
অনেক পরে বুঝতে পারি তিনি কি বলতে চাইছেন , তবে তাঁর সমজাতীয়রা
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বুঝতেন ।
উদাহরণ :- হ্যাঁরে ! কোলকাতায় যে গেলি, কি বুঝলি শহরটার
?
উত্তর এলো – অসম্ভব । মানে সে এই শহরের বিরাটত্বকে এক
কথায় ধরতে চাইলো।
এবারে ওর উচ্চারণ অনুযায়ী যদি লিখি, সেটা হবে – অশমবব
। শেষ “ব” টা অনেক দীর্ঘ । এটাই যদি লিখি, তবে পণ্ডিতরা তেড়ে মারতে আসবেন এবং এটাই
বলতে পারেন- আপনি মশাই ব্যাকরণেও “ নাস্তিক” ।
যাক, সে কথা । এবারে তাকে বললাম- এই যে তুই পাতাল রেল
দেখলি, সেটা কেমন লাগল ?
উত্তর – সাট্টাম্ ।
মানে টা হলো ভয়ংকর ভাবে সুন্দর ।
আরও একটা সমস্যা- ব্যকরণ জানতে গেলে ভালো করে , ভাষাতত্ব,
উচ্চারণ পদ্ধতিও জানতে হবে !
আমার এক বন্ধু আছেন, তাঁর ইংরেজী জ্ঞান সন্দেহাতীত । মুশকিল
তিনি আবার ফোনেটিক্স (উচ্চারণ পদ্ধতি ) পড়ান !
আমার মত রজক বাহন তাঁর উচ্চারণ শুনে বুঝতেই পারেনা, যে
কি বলছে ?
আমরা তো জানি মানডে অথচ তিনি বলছেন – মানডি ।
ল্যাও ঠালা ! এবারে এটা “ বার” ( না, ভাটিখানা নয় – রোজ
) না হাট কি করে বুঝি ? তিনি তো বলেই খালাস , আমি / আমরা বুঝি কি করে ?
গোড়ায় গলদ আরও আছে । আমরা দেখেছি রাঢ় অঞ্চলের ভাষা এবং
বানান রীতি সব জায়গায় মান্যতা পায় । কারণ, মূলে ছেল ( ছিল নয় ) সব লেখকরাই ওই রাঢ় অঞ্চলের
ই !
অতি কষ্টে আমার রাজশাহী জুবানে, আমি যখন বলি এই ভাষা তখন
লোকে সেটা কিচকিচ বলে ভেবে শাখামৃগ ( বান্দর) বলবে ।
আরও বিপদ !!
যদি লিখি – কাল রেইতে মাল্ খেয়ে, জানটা তররররররররররররর্
হয়ে গেল – প্রথমেই তেড়ে আসবে সংস্কৃত ভাষার লোকেরা ! নাসিকা কুঞ্চিত করে বইলবে ( বলে
– নয় ) এটা মড়া দাহ- শবপোড়া ভাষা !
আরবীর লোকেরা বলবে জান মাল হবে, মাল জান নয় ।
কি বিপদ !
বলি কি- এই সব দিকদর্শনের দিকদারী আর তকলিফ বোহোত হয়েছে
। বাকীটা ঠিক করবে পাঠক আর সময় !
আমরা খালি লিইখ্যে যাব ।
বহতা স্রোত যেমন সব মালিন্য মুছে নিয়ে যায়, ভাষার স্রোতও
তাকে আরও জীবন্ত করে তোলে বলে আমার দৃঢ় ধারণা ।
স্বয়ং বিদ্যাসাগর যাঁকে আমরা “ বংশগত সংস্কৃত ব্যবসায়ী”
বলেই জানি, তিনি কি করেছিলেন ?
“ শব্দসংগ্রহ” ( সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকার ৮ ই শ্রাবণ ১৩০৮
য়ে মুদ্রিত) দেখলে অবাক হয়ে যেতে হবে ।
অল্প – বেশী সাত হাজার শব্দের সংগ্রহে- মৌলিক এবং সেখান
থেকে উদ্ভব হওয়া শব্দের বাইরে খাঁটি বাংলা শব্দ বা দেশী শব্দের পাশাপাশি ফারসী, আরবী,
ইংরেজী, পোর্তুগীজ শব্দও নিয়েছেন অকাতরে ।
কেন নিয়েছিলেন ? সত্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই বলেই ।
ইংরেজ শাসন অবিভক্ত ভারতে আসার আগে, ফার্সী ছিল ভারতের
শাসনের ভাষা । তারও আগে ছিল সংস্কৃত ।
দেশজ ভাষায় যারা কথা বলতেন বা এখনও বলেন তাঁদের মধ্যেও
ছড়িয়ে পড়তে লাগল এই সব ভাষার সংমিশ্রণ ।
হট্ট- আপণ- বিপণি সরে গিয়ে এলো – বাজার, দোকান । এখন চলছে
শপিং মল । এই সব “ শব্দ” র সঙ্গে আমজনতা অতি পরিচিত ছিল তখন এবং এখনও ।
ওজন করেছিলাম, তৌলন না করে এখন ওয়েট করিয়ে নেই, ক্ষতি
কি ?
আগে আপসোস করতাম জালবাজির ফেরেবীতে পড়ে । এখন ? রিগ্রেট
করি ফর্জারির সাইকেলে পড়ে । অনুতাপ করছি প্রতারকের পাল্লায় পড়ে এটাও বলি ।
বেকুব বনে যাই মাঝে মাঝে । মোটেই বোকা হই না । বিফুল্ড
হই অবশ্য ।
কেতাবী থেকে জীবনের স্রোতে যদি ফিরে আসা যায় মন্দ কি
?
ট্রাম, বাস, ট্যাক্সি, সিনেমা, অটো ডেইলি ব্যবহার তো হয়ই
। লিখিত এবং কথ্য ভাষায়, সে “ শিক্ষিত বা অশিক্ষিত” দের মধ্যেই ।
একটা সময় যে ছিল বিদেশী, সে এখন এতই আপন ( আপণ নয় ) যে
আঙুল দেখালেও চিনতে কষ্ট হয় ।
লোন ওয়ার্ডস তাকে কৃতঋণ বা অতিথি শব্দ- যাই বলুন না কেন,
আমাদের ভাষার শ্রীবৃদ্ধি তো ঘটাচ্ছে !!!
এখন রেশন কার্ড বললে ১০০ শতাংশ লোক বুঝবেন, কিন্তু সংবিভাগ
পত্র বললে কি হবে ?
মুশকিলটা অন্য জায়গায় । " শুদ্ধ বাংলা ব্যাকরণ"
এখনও লেখা হয় নি !!
যে ব্যাকরণ গুলো আমরা পড়েছি আর পড়ি- সেগুলো সংস্কৃত ব্যাকরণের
সক্ষম অনুবাদ ।
চেষ্টা করেছিলেন- হুমায়ুন কবীর, কিন্তু সে চেষ্টা সফল
হয় নি !!
বাংলাদেশের বাংলা অ্যাকাডেমী উঠে পড়ে লেগেছে এটা তৈরি
করতে ।
আমার বন্ধু- তপন বাগচী- যিনি বাংলাদেশের বাংলা অ্যাকাডেমীর
অন্যতম কার্যকর্তা, তাঁর কাছেই জেনেছি এই খবর ।
আমরা বলি " খেদ্দাও" । কিন্তু লিখি- খেতে দাও
।
ঝিঙে একটা সাঁওতালি শব্দ । সেই হিসেবেই জানি এই সব্জীকে
।
" জ্যোৎস্নিকা" বললে- কয়জন এই সংস্কৃত শব্দ
বুঝবে ? ?
বা - পলাণ্ডু এবং তীক্ষ্ণ কন্দ ????
পেঁয়াজ রসুন বললে, সবাই বুঝবে ।
ভাষা সতী লারি বা বেবুশ্যে নয়, যে তাকে পতিব্রতা হতে হবে
।
সুতরাং আগে বঢ়ো ভাইয়া !!!! গর্দিশে যা আছে, তাই হবে
!!!
No comments:
Post a Comment