Showing posts with label ক্ষেতু বাগচী. Show all posts
Showing posts with label ক্ষেতু বাগচী. Show all posts

Friday, May 24, 2013

ঠেক


সৃষ্টিতে প্রকাশিত

সন্ধে সাড়ে ছটা বেজে গেজে, তবুও আজ চেম্বারে রুগীর বেশ ভিড়! সন্ধে সাতটার পর চন্দন ভাদুড়ী আর রুগী দেখে না, সাধারণতপ্রাণটা হাঁসফাঁস করে, একটু বিশুদ্ধ আড্ডার জন্যঅক্সিজেন পেয়ে তৈরি হয়, পরের দিনের তরে আজকের দিনে রাজা- গজা নেই ! তবুও, মাথার ওপরে একজন থাকা দরকার ! সেই মাথাটা হলেন- আড্ডার মধ্যমণি রাজা- ক্ষেতু বাগচী । সঙ্গে, গজারা হলেন- তারক মোত্তির, নাটু লাহিড়ী ‍! ওনারা এখনও কেউ এসে পৌঁছন নি !
আজ তাই, অন্যমনস্ক হয়েছিল চন্দনসত্য কম্পু একটা প্রেসক্রিপশন নিয়ে ঢুকলেন
- একি! চন্দন বাবু! আফনে , আজকের ডেট লিখতে রঙ করসেন, হোয়াই!
- কেন? ঠিক লিখি নি?
- নো! টুডে কি, একোত্তিশ- নাইন -দুহাজার টুয়েলভ? আজ তো ফাষ্ট অক্টোবর- দশ- টু থাউজাণ্ড বারো!!!!!!!!!
চন্দন জিভ কেটে তারিখটা ঠিক করলসত্য কম্পুর খুব ইংরেজি বলার অভ্যেসতাঁর ইংরেজি শুনে অনেকেই থরথর করে কাঁপেতাই নাম সত্য কম্পু! অবশ্য তিনি, চেম্বারের কম্পাউন্ডারও বটেনোয়াখালীর আদি বাসিন্দা! এখনও কথায় কথায় মাতৃভাষা, সত্য কম্পুর মুখ নিঃসৃত হয়
গতকালই সত্য কম্পু বলেছিলেন:- দি ফিফল অফ নুয়াখালি ক্যান্ট স্ফিক ইংলিশ ফফারলি! হাউ হ্যাথেটিক!
চন্দন কোনোরকমে হাসি চেপেছিলভাগ্যিস, ওই সময় ক্ষেতু বাগচী এসে পৌঁছন নি
শেষ, বাচ্চা রুগীটির মা একটু খুঁতখুঁতে চন্দন লিখেছিল ফোটান জল দিয়ে ওষুধটা, শিশির মধ্যেই সিরাপ তৈরি করে নিতে। বাচ্চাটির মা ওষুধ কিনে নিয়ে এসে বললেন- আচ্ছা ডাক্তার বাবু, আমি ডিসটিলড্ ওয়াটার দিয়ে সিরাপটা তৈরি করতে পারি না?
 
চন্দন হেসে বলল- ডিসটিলড্ ওয়াটার তো ব্যাটারিতে ঢালে! আপনি ওষুধে ঢালবেন?
বাচ্চাটির মা
ও তাই তো! বলে, মাথা নেড়ে চলে গেলেন।

সত্য কম্পু বললেন- গুড কাজ ডান !

কি করবো বলুন? পেসেন্টরা এত আজগুবি কথা বলে!- চন্দন উত্তর দিল।

বল হরির চায়ে চন্দন এক চুমুক দিতে না দিতেই, কবি বদরী সান্যালের হাসি হাসি মুখে প্রবেশ।


 টুডে কেন, ইস্মাইলিং মুখ
? - সত্য কম্পু জিজ্ঞেস করলেন!


নাগেরবাজার- হাওড়া রুটের, একটা নতুন মিনিবাসের বডির পেছনে, দু লাইনের কবিতা লেখার অনুরোধ পেয়েছি! বদরী বাবুর উত্তর!
ওয়ান্ডারফুল! বলে ক্ষেতু বাগচীর প্রবেশ।
-                      তা লিখেছেন? চন্দন বলল।
-                      হেঁ! হেঁ! লিখে এনেছি শোনাতে! শুনবেন?
-                      আরে শোনাও, শোনাও! তারক মোত্তিরও বলতে বলতে ঢুকলেন!
-                      তালে, শোনাই? বদরী লজ্জিত মুখে বললেন!
-                      হুম ! শোনাও না! ভ্যানতাড়া করছ কেন হে! ক্ষেতু বাগচী ক্ষেপচুরিয়াস!



বদরী শুরু করলেন:-
এক ফুল, দো মালী
শ্যামবাজার লোড, হাওড়া খালি!
-বেড়ে! বেড়ে! হাততালি দিয়ে উঠল সবাই!
শুধু ক্ষেতু বাগচী বললেন- এক ফুল, দো মালী, এই লাইনটা কেন?
ওই মিনিটা, জামাইবাবু আর তারা শালা মিলে কিনেছে! তাই ফুল হলো মিনি আর মালী হল- দুজন! সিম্পল! বদরী বাবুর উত্তর।
না:! বদরী আজকাল বেশ লিখছে, এটা মানতেই হবে। ক্ষেতু বাগচী আজ বেশ উদার!
-আচ্ছা! এখানে ব্লু ড টেস হয়?
বলে এক ভদ্রলোক ঢুকলেন। বেশ ধোপদুরস্ত পাজামা- পাঞ্জাবী শোভিত।
-ব্লু ড? চন্দন একটু ভুরু কুঁচকে ভদ্রলোকের দিকে তাকাল।
- হুম! ব্লু ড!
- ম্যাটারটা কি! কি  করাতে চান আফনি? সেটা টেল ! সত্য কম্পু বললেন।
- আরে মশাই ডাক্তারের চেম্বারের আপনারা !!!! ব্লু ড টেস জানেন না?
- এটা কি ইংরেজি শব্দ? তারক মোত্তির জিজ্ঞেস করলেন।
- হাজার বার ইংরেজি শব্দ। মেডাইসিন টের্মও বটে।
- একি রে বাবা! ব্লু ড ইংরেজি শব্দ আবার মেডাইসিন টের্ম? চন্দন অবাক।
- মনে হয়, একটু একটু বুঝতে পারছি। আচ্ছা! আপনি ইংরেজি বানানটা বলুন তো!তারক মোত্তির বললেন।
- বি, এল, ও, ও, ডি! এইবার বুইলেন?
- ও ও ও !!!!!! ব্লাআআড! এত বছর মাস্টারি করেছি, মাইরি! বাপের জন্মে এরকম উরুশ্চারণ শুনি নি! তারক মোত্তির চেঁচালেন।
- অ অ ! তা কত বছর মাস্টারি কইরেচেন? ভদ্রলোকের ভুরু কুঁচকে গেল !!!
- পঁয়ত্রিশ বছর!
- কত মাইনে পাইতেন, একটু বইলবেন? কিছু মনে কইরবেন না!
- শেষের দিকে মাসে কুড়ি হাজার টাকা পেতাম। বুঝলেন! কুড়ি হাজার টাকাআআ! নট এ ম্যাটার অফ জোক! তারক মোত্তির ক্রোধান্বিত।
- ছোঃ! আপনার মাস্টারি রাখুন মহায়! এই উরুশ্চারণ নিয়ে আমি এখনও মাস গেলে চল্লিশ হাজার টাকা রুজগার করি! বুইলেন! উরুশ্চারণ শেখাচ্ছেন আমায়! হুঃ!
- কি করেন আপনি? ক্ষেতু বাগচী এতক্ষণে মুখ খুললেন।
- আমি উকিল!
- নাম?
- আমাকে ভালো নামে কেউ চেনে না।
- ভালো নামে আবার উকিলদের কে চেনে ? খারাপ নামটাই বলুন না।
- আরে ধ্যুস!  আপনি কিন্তু রেজিয়াল কমেন্ট করছেন !!! খারাপ নাম হবে কেন?
- রেজিয়াল !!!! ও ! রেসিয়াল  !! না রেসিয়াল কমেন্ট করবো কেন ? মানে, উকিলদের তো খুব একটা সুনাম থাকে না! তাই বলছিলাম আর কি!
 - হেঁ হেঁ! খুব নামডাক আমার! বুইলেন? আম্মো ভোলা সরকার। খাঁটি বারিন্দির!
- বুয়েচি! বারিন্দির ছাড়া এরকম বর্ডারলাইন কেস হয় নাকি? ক্ষেতু বাগচী উবাচ!
- মানে?
- মানেটা কিছুই নয়! বারিন্দিররা জাত পাগল! তা আপনি একটু বর্ডারলাইন কেস! ওই আপনার উরুশ্চারণের জন্য। বলছিলাম, টেস মানে তাহলে টেস্ট আর মেডাইসিন টার্ম মানে মেডিক্যাল র্টাম! তাই তো?
ভোলা সরকার মনে হলো, এবার একটু সতর্ক! সেটা বোধহয়, ক্ষেতু বাগচীর ছ ফুটি চেহারা আর বাজখাঁই গলা শুনে!
তা হলে, ইউ আসুন টু মোরও সকাল! সত্য- কম্পু বললেন।
এবার আসরে নামল, চন্দন!
-                      আপনার ব্লাড টেস্ট না হয় করা যাবে! সেটা কিসের জন্য, বলবেন?
-                      আর বলবেন না মহায়! আমার চোখ আর জিভ নাকি খারাপ!
-                      ডাক্তার দেখিয়েছেন?
-                      হ্যাঁ!
-                      চোখের ডাক্তার?
-                      না! আমার বৌ বলেছে!
-                      সে কি! আপনার বৌ কি ডাক্তার নাকি!
-                      না! তবে উনি মনে করেন, ডাক্তারি উনি জানেন! উনি সবজান্তা!
-                      তা কিজন্য ওনার মনে হলো,যে আপনার চোখ খারাপ?
-                       মহায়! আজকাল, আমি ভাতকে ভাত দেখি, ময়দাকে ময়দা দেখি, লুচিকে লুচি, মাছের ঝোলকে মাছের ঝোল!
-                      তালে? গণ্ডগোলটা কোথায়?
-                      ওটা বুঝলেই তো এই বর্ডারলাইন কেসটা সারে!
-                      মানে?
-                      কোনো খাবারের টেস পাচ্ছি না আজকাল! তাই বৌকে বলেছিলাম, তুমি কি রানচো দেখি আজকাল! কোনো কিছুই বুইতে পারছি না!
তা বৌ বলল- কেন? এই তো যা রোজকার খাবার! তাই তো দিচ্চি তোমায়!
আমি বইল্লাম! এডা তো ভাত দেকচি! কিন্তু ভাতের টেস পাচ্চি না!
বৌ বল্লে:- কিসের টেস পাছো?
আমি উত্তর দিলাম:- কেমন গোবোর গোবোর টেস! অতচ, ভাতই তো দেখচি!
বৌ রেগে গিয়ে বল্লে:- সব ঠিক দেকচো কি ? তোমার চোখ আর জিভ খারাপ হয়েসে। চোখ আর জিভ পরীক্ষার আগে ব্লু ড টেস করে নেবে, তারপর ডাক্তার দেকাবে।
ব্যাস! হয়ে গেল! তাই তো আমি একাজে এয়ে-চি!!!!!!!
আপনি বৌয়ের কথা খুব মান্য করেন দেখছি ! চন্দন বলল !
শুধু মাত্র বিবাহিত পুরুষদের জন্য স্বর্ণাক্ষরে লিখিত নিয়মমেনে চললে, কোনো দুক্কু থাকবে না ! ভোলা সরকার বললেন ।
কি রকম ?

নিয়ম- ১ স্ত্রীরা সবসময়ই ঠিক বলে ।
নিয়ম- ২ এর অন্যথা হলে, নিজের দুইগালে নিজেই থাপ্পর মারবেন
নিয়ম- ৩ তার পর, নিয়ম-১ পালন করুন ভোলা সরকারের জবাব ।
ক্ষেতুদা বললেন:- হুম! বুঝলাম। কিন্তু আপনি তো দেখছি, বাগবাজারী ভাষায় কথা বলছেন! এটা তো বারিন্দিরদের ভাষা নয়!
ঠিক! ঠিক! ভোলা বাবুর উত্তর! আমার বৌ, বুইলেন কিনা, ওই বাগবাজারের লোক! ওরাও বারিন্দির, তবে কেষনগর থেকে বাগবাজারে এয়েচেল। সেই থেকে তার অব্যেস! তাই আমারও হয়ে গেচে।
এ তো দেখছি, বদরীর এক ফুল দো মালীর কেস! একজন লোক, তার মুখে আবার দুরকমের ভাষা! হরি হে! তুমিই সত্য!!!!!! ক্ষেতু বাগচী দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন। নাম শুনে, বল হরি একবার উঁকি দিয়ে গেল।
-                      বদরী সান্যাল বেশ খুশী হয়ে বললেন:- ক্ষেতুদা! চিকেন রোল খাবেন?
-                      তুমি খাওয়াবে?
-                      হ্যাঁ!
-                      আনাও, আর হ্যাঁ- এই ভোলাবাবুর জন্যও কিন্তু আনাবে! আমরা তো আছিই!
তা ভোলাবাবু, আপনি কেষনগরে বিয়ে করলেন কেন?
-                      আর বলবেন না! বাবা বলতেন:-

বাজার করবি ঘুরে ঘুরে
শ্বশুর করবি দূরে দূরে
মানেটা বুঝিয়ে বলবেন? ক্ষেতুদা বললেন।
-                      মানে হল গিয়ে, বাজার করতে হবে ঘুরে ঘুরে। তা হলে ওজন আর দাম ঠিক পাবেন! বুইলেন কিনা ! আর শ্বশুরবাড়ী দূরে করলে, মান – ইজ্জত পাওয়া যায় ! বুইলেন কিনা !
-                       শ্বশুরবাড়ীর কেস আর দামটা না হয় বুঝলাম, কিন্তু ওজন কেন?  পরিচিত দোকানদাররা ওজনে ঠকায় না!
-                      আর বলবেন না মহায়! আরও একটা কথা বলতেন বাবা!
-                      কি?
যার হাতে দাঁড়িপাল্লা
তার নেই খোদাতাল্লা!
-                      এর মানে?
-                      মানেটা সহজ! যার হাতে দাঁড়িপাল্লা আছে সে ঠকানোর জন্য ভগবানকেও ভয় পায় না। বুইলেন কিনা!
-                      এবার বুঝেছি! এই ক্যাচ লাইনটা একটু ঘুরিয়ে, আবার একটা খবরের কাগজের ইউএসপি কিনা ! যাক্ !!! আপনি উকিল তায় বারিন্দির! বলুন বলুন!
-                      কি আর বলবো মহায় ! আমি বাড়ীতে বাঘ , তবে!
-                      তবে?
-                      আমার বৌ রিং মাষ্টার !
হো হো করে হেসে উঠলো সবাই !
-                      তা ভোলা বাবু, আপনি কি গুল টুল মারেন ? ক্ষেতু বাগচী ছুঁড়ে দিলেন প্রশ্নটা ।
-                      উকিল মানুষ, বুইলেন ! সে তো মারতেই হয় ! উপার্জনের ব্যাপার ! বুইলেন কিনা !
-                      কি রকম ? দু- এক পিস স্যাম্পল ছাড়ুন !
-                      এ ব্যাপারে, আমার মায়ের বাবা, মানে দাদু ওস্তাদ ছিলেন ! বুইলেন কিনা !
-                      আচ্ছা?
-                      হ্যাঁ ! তবে আর বলছি কি ? বুইলেন কিনা ! একবার স্নানের সময় দিদিমার কাছে সরষের তেল চেয়েছিলুম । দাদু বললে- সে ছিল আমাদের সময় ! নদীতে যাওয়ার আগে, সরষের খেত থেকে সরষে তুলে, হাতে পিষে খাঁটি সরষের তেল গায়ে মেখে স্নান করতাম !
-                      আপনার দাদুর দুই হাত তো একেবারে ঘানির মত ছিল, বলুন !
-                      হ্যাঃ !  তা যা বইলেচেন ! এক্কেরে বামপন্থী থাবা !
তারক মোত্তির আর থাকতে পারলেন না ! ছড়া কাটলেন :-
রসকস নেই গন্ধ ছাড়ে
কুকুর  চিবোয় শুকনো হাড়ে
দুকষ বেয়ে  রক্ত ধার
বড়ই বাহার লেগেছে তার

-                      কি বইলেন ! আমি কুত্তা? ভোলা সরকারের গর্জ্জন
-                      আহা ! ব্যাপারটা ওই ভাবে নিচ্ছেন কেন ? ক্ষেতু বাগচী পরিত্রাতার ভূমিকায় !  পুরোন গপ্পো এভাবে বললে- বারিন্দিররা এই প্রবচন বলে !  আপনি বুদ্ধিমান লোক, মানেটা বুঝবেন, একটু ভাবলেই !
-                      অ !
-                      তবে, একবার লাউয়ের বিচি ফেলে ছিলাম , আমার কিচেন গার্ডেনে ! বিরাট লাউ হলো এক- একটা ! রিক্সা- ওয়ালা মধু বলল , আমাকে একখান দ্যান কত্তা ! দেশে নিয়ে যাব ! বনগাঁ লাইনের ঠাকুরপুকুরে ওর বাড়ী ! ই. এম. ইউ কোচের দরজা দিয়ে লাউটা তুলতে না পেরে , ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিল মধু! তারপর, দিন তিনেক হাঁফিয়ে ছিল ! ক্ষেতু বাগচী, সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন ।
-                      এ তো কিছুই না ! তারক মোত্তিরের প্রতিক্রিয়া !
-                      কিছু যেটা হলো, সেটা কি ? রেগে গেলে ,ক্ষেতু বাগচীর চোখ পিটপিট করে  ।
-                      এভরিটাইম, আফনে খচিতং !  এবারে সত্য কম্পু মুখ খুললেন । আরে, তারকদারে কইতে দ্যান !!!!
-                      বল হে তারক, ক্ষেতু বাগচী কেন যেন এবারে উদার !
-                      আমার বাবা, একবার বেখেয়ালে  করলার একটা ছোট গাছ লাগিয়েছিলেন কিছুদিন বাদে দেখলেন- ছয় বিঘা জমি জুড়ে, খালি করলার গাছ ! ট্রাকেক্কে ট্রাক করলা বেচে আমাদের বর্তমান তিনতলা বাড়ীটা বাবা বানিয়েছিলেন । হুঁ ! হুঁ ! বাওয়া, এক্কেরে নিয্যস সত্যি কথা !
-                      তোমার স্বাধীনতা সংগ্রামের মত, বাবা তারক ? ক্ষেতু বাগচী মুচকী হেসে বললেন ।
-                      কি রম্, কি রম‌্ ? ভোলা সরকার উৎসাহিত ।
-                      বাবা তারকনাথ স্বয়ং পেজেন ছিলেন গাঁধির সঙ্গে, গোলটেবিল বৈঠকে !
-                      হ্যাঁ ! ক্ষেতুদা ঠিকই বলেছেন । উনি তো হিটলারকে নিয়ে পালিয়েছিলেন, পরে রটিয়ে দ্যান, হিটলার আত্মহত্যা করেছেন !!!! অবশ্য আমাদের দাদার জন্ম- উনিস্সো পঁয়তাল্লিস সালে ।

এক মধ্যবয়স্ক  দারা সিংয়ের মত মহিলা এসে দাঁড়ালেন, চেম্বারের দরজায় !
-                      আসতে পারি ?
-                      আসুন, তবে পেসেন্ট দেখা বন্ধ এখন ! সত্য কম্পু বললেন ।
-                      আমি তো পেসেন্টের খোঁজেই এসেছি এখানে ! নিজেকে উকিল বলে পরিচয় দ্যায় । ওনার টপ ফ্লোরে একটু গণ্ডগোল আছে । উনি আসলে একটি হনুমান !  তা, লোকে বলল- একানে এয়েছেন ! তাই এলুম ।
ক্ষেতু বাগচী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন – চলি হে চন্দন । তোমার বৌদি ঘন ঘন মিসড্ কল দিচ্ছেন । তারক মোত্তিরেরও একটা জরুরী কাজ মনে পড়ল।
লিটার লিটার ঘাম ঝরানো ভোলা সরকারকে বগলদাবা করে ভদ্রমহিলা  হাঁটা দিলেন

.........সমাপ্ত...............










আড্ডা ( ক্ষেতু বাগচী সিরিজের প্রথম গল্প)



সৃষ্টিতে প্রকাশিত


ঈশাক্ষীর উসুর্ব্বুদে মারা গেল মার


নাকেতে নির্জ্জরগণ করে হাহাকার”
হুংকার দিয়ে উঠলেন - ক্ষেতু বাগচী!
- বল্, দেখি এর মানে কী? কাব্যি চর্চা হতিসে? যত্ত সব! সবাই চমকে গেল! এ আবার কোন ভাষায় কথা বলছেন ক্ষেতুদা! হুংকারের চোটে বদরী বাবু চেয়ার থেকে ছিটকে পড়লেন, “বল হরির চায়ের গ্লাসে চিনি মেশানোর শব্দটা ফাটা রেকর্ডের মত চলতেই থাকলো। তারক খুড়ো, নেশালু চোখ খুলে কে কে বলে চেঁচিয়ে উঠলেন! হলটা কী? উগ্রপন্থীরা কি হানা দিয়েছে না বোম ফাটালো কেউ!!!!! ক্ষেতু বাগচী আবার একটা হুংকার দিলেন - ল্যাভেণ্ডিস্!!!!!!!! সবার পিলে চমকে উঠলো! কয়েকদিন আগেই ভূমিকম্পের রেশ রয়ে গেছে! আজই কি পৃথিবীর পালা কীর্ত্তন শেষ?
কিন্তু এই কাণ্ডকারখানার পরিপ্রেক্ষিতটা কী? খুলেই বলা যাক!

রোগীর ভিড় কম থাকায় সন্ধে বেলায় চন্দন ডাক্তারের চেম্বারে আড্ডা বসে। আড্ডার বিষয় টালা থেকে টালিগঞ্জ! তারক খুড়ো মানে তারক মোত্তির স্বদেশী করতেন। বয়স হলেও বেশ তরতাজা! চেহারা এবং মনেও। একটা স্কুলে বাংলা পড়িয়েছেন এককালে। এখন অবসর নিয়েছেন। সন্ধে হলেই একটু চোখটা লাল হয়। বিলিতি খান না। চিরজীবন স্বদেশী করে এসেছেন, তাই দিশিখান। জিজ্ঞেস করলে বলেন - হুঁ হুঁ বাবা! স্বদেশী করেছি, তাই চরিত্রভ্রষ্ট হই নি!
তারক মৈত্রের স্বদেশী করার কথায় সবার একটু কিন্তু কিন্তু আছে! তা সে যাক গে!
কয়েকদিন আগে যেমন, হঠাৎ বল হরিজিজ্ঞেস করেছিল-
আচ্ছা! ভগবানের হাইট কত?
ক্ষেতু বাগচী বলেছিলেন - এক্সাট হাইট টা বলতে পারবো না! তবে তিনি গড়পড়তা মানুষের থেকে অনেক অনেক খাটো!
- কেন? সকলেরই জিজ্ঞাসা!
- না হলে, সবাই কেন বলবে- ভগবান!!!! মুখ তুলে চাও!!!!!
চন্দন ডাক্তার লোকটি বেশ ভালো। ডঃ চন্দন ভাদুড়ি - এম.বি.বি.এস।পশার বেশ জমজমাট।অনেক গরীব লোক পয়সা দিতে না পেরে, জমির কলাটা, মূলোটা দিয়ে যায়! হাসি মুখে তাই নেয় চন্দন ডাক্তার। রাত বিরেতে লোকে ডাকলে চন্দন হাসিমুখে হাজির। এইখানে শহরতলীর গঞ্জে রিক্সা চলে। কোলকাতা শহর বাসে মাত্র ৬ টাকার দূরত্ত্ব। বাস রাস্তার ওপরেই চেম্বার। এর পাশেই হরির চায়ের দোকান! বল হরিবলেই পরিচিত। গান করতে করতে হরি চা বানায়! বদরী সান্যাল প্রায়ই ওকে অন্যমনস্ক হয়ে চা বানাতে বলেন। বদরী বাবুর বক্তব্য-এতে বল হরি”, চাটা যদি দৈবাৎ ভালো বানায়!
আজকের আড্ডাতে বদরী সান্যালের লেখা কবিতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। কবিতাটা এরকম:-
অনন্ত কাল ধরে, তোমারই প্রতীক্ষায়
খুঁটে খুঁটে খাচ্ছি সময়।
গরুর পাল হাঁচে, সেই গোধূলিবেলায়
ছড়িয়ে যায় কত গোময়।
তবু তুমি আসো নাকো, দেরী কেন হয়?
এটা, বদরীবাবুর ৩২৭১ তম অণু কবিতা। পত্র পত্রিকায় পাঠান, কিন্তু তারা ছাপে না। সম্পাদকদের কবিত্ববোধ সম্বন্ধে বিরক্ত হয়ে তিনি, তাঁর একটা কবিতা; এ ফোর সাইজে প্রিন্টিত” (বদরী বাবুর নিজের ভাষা) আকারে রাতে পাড়ার দেয়ালে দেয়ালে সেঁটেছিলেন। কুলোকে বলে চন্দন ডাক্তারের পশার বাড়ার এটা অন্যতম কারণ।
লোকে কবিতা পড়ছে আর মৃগী রোগী হয়ে গিয়ে চন্দন ডাক্তারের কাছে ছুটছে! কবিতাটা পড়ে, লোকে এই কারণে বদরীবাবুর ঠিকানা হন্যে হয়ে খোঁজ করেছে কিছুদিন। চন্দন পরামর্শ দিয়েছিল, বদরীবাবুকে- দাদা, আপনি এক্ষুণি চিৎপুরে গিয়ে মেক আপ নিয়ে মুখটা পাল্টে নিন! না হলে কিন্তু ঘোর বিপদ আপনার!
বল হরিকিন্তু বদরী বাবুর খুব ভক্ত! 

মহম্মদ রফীর গানের সুরে ওনার লেখা কবিতাগুলো চা বানাতে বানাতে গায়! বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে গানের রিয়ালিটি শোয়ে নাম দেবার কথা ওর মাথায় বদরীবাবুই ঢুকিয়েছেন। বদরীবাবুর ইচ্ছেটা অবশ্য অন্য কারণে!
নাটু লাহিড়ী সর্দ্দির জন্য ওষুধ নিতে এসেছিলেন! ক্ষেতু বাবুর ল্যাভেণ্ডিস্, শুনে মিউ মিউ করে বললেন!
লবেঞ্চুস? ওটার কারখানায় তো ধর্মঘট!
তারক মোত্তির বললেন - ধর্মঘট, কী সমাস?
নাটু লাহিড়ী উত্তর দিলেন- ধর্মঘট হচ্ছে কমাস! মানে কয় মাস!!!!! ওপস! তারকদা!!!! খালি মাষ্টারী ফলান কেন? যাক! তাআআআআ ধর্মঘট- ৭ মাস হয়ে গেল!!!!
ক্ষেতু বাগচী আবার বললেন- যাও হে! যত্ত সব ফ্যাদরা প্যাচাল! বলো ওই দুই লাইনের মানে কী?
নাটুবাবু দুবার ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে হেঁচে বললেন- আমি পরে আসব চন্দন! কে যেন বলল, কোথায় যেন, কটার সময় যেতে হবে! কার যেন আসার টাইম হয়ে এসেছে! আমি যাই! বলে, সুড়ুৎ করে কেটে পড়লেন।
চন্দন বলল- দাঁড়ান ক্ষেতুদা! একটু দম নিতে দিন। আপনি যা ভয়ংকর হুংকার দিলেন। পিলে এক্কেরে চলকে উঠিসে। আই বাপস্।
ক্ষেতুবাবু আবার ক্ষেপে গেলেন।
- আমি তো বসেই রয়েসি! খামাকা দাঁড়াব কেন হে? যত্তসব! ওই বদরী যত নষ্টের গোড়া! রোজ একটা করে কবিতা শোনাবে আর আমার কোষ্ঠকাঠিন্য হবে! আজ ইসপার কি উসপার!
বদরীবাবু অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন- আমার কবিতার সঙ্গে আপনার কোষ্ঠকাঠিন্যের সম্পর্ক কী?
- তুমি কবিতার কী জানো হে ছোকরা! খালি কতক অর্থহীন শব্দ লিখে অনর্থক কর্ণ কণ্ডুয়ন করো। তাইতেই তো আমার কোষ্ঠকাঠিন্য হয়!
- যাঃ! বাবা !!!!আমায় ছোকরা বলছেন? আমার রিটায়ার করার ৪ বছর হয়ে গেছে! হে ভগবান!! মুখ তুলে চাও!!!!!
- বদরী, তুমি আর ভগবানকে মুখ তুলে তোমার দিকে চাইতে বল না! ভগবানের পোনডাইটিস হবে! যা ঢাউস-ঢ্যাঙ্গা তুমি!!!!! তোমার একটাই প্লাস পয়েন্ট! গরীব রুগীরা ডায়ারিয়ায় ভুগলে আর চন্দনকে ওষুধ লিখতে হবে না! তোমার কবিত গুলো পড়িয়ে দিলেই হবে।
চন্দন বলল- ক্ষেতুদা ওটা স্পোণ্ডিলোসিস হবে! পোনডাইটিস নয়!
- আরে ছাড়ো হেঃ!
ইতিমধ্যে বল হরি চা নিয়ে এসেছে! ক্ষেতু বাগচী গুণগুণ করে গাইতে শুরু করলেন-
চায়ে চর্বি
বিড়িতে বল
বাদবাকী যা খাবি
সবই অম্বল!

চা-তে সুরুৎ করে একটা চুমুক দিলেন- তারক মোত্তির! একটা বিড়ি নিয়ে কানের কাছে ধরে পাকিয়ে, দেশলাই দিয়ে বিড়িটা ধরিয়ে বললেন- ঠিক আছে ক্ষেতুদা! আপনার ওই বিদঘুটে কথাগুলোর মানেটা বলুন।
বিদঘুটে! তোমার গিদরিং জ্যাম করে দেব কিন্তু, তারক!
আহা! রাগ করেন কেন, ক্ষেতুদা! তারক মোত্তির ভিসুভিয়াসের মত বিড়ির ধোঁয়া ছেড়ে বললেন। 

-মাফ করে দিন!

বলছি- কিন্তু ফের যদি প্যাচাল পাড়িচ আর ওই বদরী ব্যাটা কবিতা শুনিয়েচ, তো ওরই একদিন কি আমারই একদিন। ক্ষেতু মোত্তির উত্তর দিলেন।
না! না! কিছু বলবে না বদরীদা! আপনি প্লিজ বলুন! চন্দন ডাক্তার বলল!
বলছি! কিন্তু বলার সময় ভজর ভজর করবে না কানের কাছে। ক্ষেতু বাগচী বললেন।
আরে না! বলুন, বলুন!

বেশ বলছি!

ঈশাক্ষী মানে মহাদেব! বুঝলে হে! উসুর্ব্বুদের মানে হল, মহাদেবের ঊর্দ্ধনয়ন থেকে রোষানল! মারা গেল মার, – এর অর্থ হলো মরে গেল কামদেব। মার হলো কামদেবের আর এক নাম! নাক হলো স্বর্গ! আর নির্জ্জর হলো যাদের জরা নেই! মানে- দেবতারা!
তাহলে পুরো মানেটা কি দাঁড়াল ক্ষেতুদা? - চন্দন ডাক্তার জিজ্ঞেস করল!
মহাদেবের ঊর্দ্ধনয়নের রোষানলে মদনদেব মারা গেলে স্বর্গে দেবতারা হাহাকার করতে লাগল- বুইচ হে!
- বাবাঃ! কী জিনিস গুরু! ক্ষেতুদা!
- হুঁ! হুঁ! এটা কি বদরীর ফ্যাদরা প্যাচাল নাকি! খালি, ইং তাং কিরিমিচি!
- উফ্! এই ইং তাং কিরিমিচি টা আবার কি? চন্দন বলল।
- ওটা বদরীকে জিজ্ঞেস কর! বাঁদরের মত কবিতা লেখে ব্যাটা!
- সে না হয় বুঝলাম- কিন্তু ল্যাভেণ্ডিস কথাটার মানে কি?
- তুমি একটা লাওয়াঞ্জে লাওয়ারিস! ল্যাভেণ্ডিস এর মানে হচ্ছে ল্যাভেণ্ডার সাবান!
- যা! বাবা! এ আবার কী ভাষা!
- বদরী যদি প্রিন্টিত বলতে পারে তো আমি কেন ল্যাভেণ্ডিস বলবো না চন্দন!
- হুম! কিন্তু আবার একটা কথা ব্যবহার করলেন- লাওয়াঞ্জে লাওয়ারিস! ওটা আবার কি?
- লাফাঙ্গা আর যার কোনো ওয়ারিস নাই!
বদরী খেপে গেলেন।
দেখুন, ক্ষেতুদা - একে আপনি বয়োজেষ্ঠ তার ওপর বারিন্দির! আমারই জাতভাই! তাই কিছু বলছি না! তা বলে আমাকে এ ভাবে অপমান করবেন?
- কোথায় অপমান করলাম? আমি তোমার এই মাথামুণ্ডুহীন কবিতার প্রতিবাদ জানালাম! বুয়েচ? আর বারিন্দিরদের কথা বলো না ভায়া! প্রবাদ আছে- বারিন্দির মরে ভাসে জলে, কাক বলে এ কোন ছলে!!!!! কাকের মত ধূর্ত প্রাণীও বারিন্দিরদের মড়া ঠোকরাতে সাহস পায় না! এত প্যাঁচ বারিন্দিরদের! আমি তো খোলাখুলি বলেচি তোমায়!
- হে! হে! ঠিক বলেছেন ক্ষেতুদা! তারক মোত্তির বললেন।
বুঝলে বদরী!‍ এখানে তো সবাই বারিন্দির!
তাই পেরেকদের নিস্তার!

কেন? গম্ভীর স্বরে বললেন বদরী!
এই দ্যাখো! রাগ হয়েসে তো? তা পুরুষের রাগ থাকা ভালো! বারিন্দিরদের তো পেছন ভরা রাগ!
- যাক! ওই পেরেকের কথা কি বলছিলেন, ক্ষেতুদা! বলল, চন্দন।
- বলব আর কী! বারিন্দিরদের মাথায় পেরেক ঢোকালে ইস্ক্রুপ হয়ে বেরোয় জানো?
- ঠিকই তো! নাটুদার সঙ্গে গায়ে গা ঠেকলে, নাটুদা উল্টো সাত পাক ঘুরে যান! জিজ্ঞেস করলে বলেন - প্যাঁচ ছাড়াচ্ছি! এ্যাতোদিনে বুঝলাম কারণটা!
বল হরি, খালি চায়ের গেলাস গুলো নিতে এসেছিল! এই কথা গুলো শুনে হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিল।
- ওরে কাঁদিস ক্যান রে ছোকরা!
- কাঁদবু নি! আপনাদের সঙ্গে কত্ত যে গা ঠোকাঠুকি হইসে! এ্যাহন আমার কি হইবো!
- হবে আবার কি! তোর ওই চোখের জলে তো আর শ্যাওলা পড়বে না! বুদ্ধি বেড়ে যাবে!
- বুদ্ধি বাড়বো? ঠিক কইতাসেন?
- ছ্যাঁচরামি বুদ্ধিটা বাড়বে!
আর বেড়ে লাভ নেই! এমনিতেই ১০ টা চা খেলে ১৫ টা চায়ের পয়সা চায়! তার ওপর যদি... থাক, আর বললাম না। - বললেন তারকখুড়ো।
বদরীদার কবিতা নিয়ে আলোচনা হবে না? বলল চন্দন!
আলোচনা করে লাভ নেই, বদরীর কবিতা পাবলিক খাবে না! যত্ত সব ভাট বকা! ক্ষেতু বাগচী ফায়ার হয়ে গেলেন!!!
ব্যাপার স্যাপার দেখে তারক মোত্তির বললেন -
নাঃ! উঠি! রাত ১০ টা বাজে। এরপর বাড়ী গেলে গিন্নি ঠ্যাঙ্গাবে!
বলে চেয়ার থেকে উঠে পড়লেন। 

তা হলে আজকের মত এখানেই আড্ডা শেষ? বলল চন্দন! 

হ্যাঁ! হ্যাঁ! শেষ! বেশী আড্ডা আর আলোচনা করলে আবার ভূমিকম্প হবে!
চলো হে! বাড়ী যাই! ক্ষেতু বাগচী একটা চলন্ত রিক্সা ধরে উঠে পড়লেন।

গাছ- মা

দিয়ালা -কিশোর ওয়েবজিনে প্রকাশিত
গাছ- মা
রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য
রোজ ভোরবেলায়, পিন্টু একবার মায়ের কাছে যাবেই। মায়ের পাশে শুয়ে শাড়ীর গন্ধ শোঁকে পিন্টু। বাবা, ঘুম থেকে উঠেই বাজারে চলে যায়। বাড়ীতে ফ্রিজ থাকা সত্ত্বেও টাটকা মাছ চাই বাবার। রোদ- ঝড়- জল, কোনো কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।একবার ভারি বিপদ হয়েছিল। ভারী বৃষ্টি আর ঝড়ের মধ্যে বাবা ছাতা নিয়ে, বাজার করে বাড়ি ফেরার সময় তাল রাখতে পারে নি। বাবা আবার পাজামা পরতে পারে না। কাটা লুঙ্গি পরে। মায়ের সাথে কোনোদিন বাবার ঝগড়া দেখে নি পিন্টু। সেদিন, দেখেছিল।
ছাতা, বাজারের থলে আর কাটা লুঙ্গি কোনোরকমে মুঠোতে ধরে, বাবার ফেরত আসা দেখে মায়ের সে কি চোপা!!!!!!!
বলেছিল- পাজামা পরতে পারো না! ভরবাজারে লোকের সামনে লুঙ্গি খুলে গেলে কি হত?
বাবা সমানে হো হো করে হেসেই যাচ্ছিল। মায়ের মুখ গোমড়া!
বাবা বেরিয়ে গেলেই মা আবার এসে খানিকটা শুয়ে থাকে, সাধনা মাসী না আসা পর্যন্ত। মাসীই রান্না করে, তবে, মাছের ঝোল টা মা না রাঁধলে, বাবা কিছুতেই খেতে পারে না। মার স্কুল থাকে, তবে ওইটুকু রান্না না করলে, মায়েরও শান্তি হয় না।
সকালের এই সময়টাই পিন্টু মায়ের কোল ঘেঁষে শুয়ে থাকে।  লম্বা ছায়ার একটা নিরাপদ আশ্রয়। পাউডারের হাল্কা গন্ধ ছাপিয়ে আর একটা সুন্দর গন্ধ। এটা অনেক দামী ডিয়োডোরেন্ট মনে হয় পিন্টুরসারা গায়ে মায়ের এই গন্ধটা সে চাকুম- চুকুন করে চেখে , গায়ে মেখে নেয়। এই সময় মাকে, মনে হয় বট- গাছ
পিন্টুদের পাড়ায় একটা বট- গাছ ছিল। তাতে, প্রচুর পাখীর বাসা। সকাল বেলায় প্রচুর পাখীর কিচির- মিচির শুনতে ভালো লাগতো।
গাছটাকে-পিন্টুর, মা বলেই মনে হত। সবাই কেমন আশ্রয় পায়।
আজ রোববার। খুব একটা তাড়া হুড়ো নেই! তার ওপর ক্ষেতু দাদু অনেকদিন পরে আজ আসবেন। বাবার মামা, এই ভদ্রলোক জীবনে প্রচুর দেশ- বিদেশ ঘুরেছেন কাজের জন্য। প্রচুর পড়াশোনা করা আর খুব আমুদে লোক।
মা বলল:- ছাড় রে পিন্টু! আমি এবার উঠি। ময়দা মাখতে হবে। ক্ষেতু মামা ফুলকো লুচি খেতে ভালোবাসে! তবে, আজ হিংয়ের কচুরী করবো । দাদুর এটাও খুব ফেভারিট ডিস ।
পিন্টু কচুরীর নামে লাফিয়ে উঠে ছেড়ে দিল মাকে। ক্ষেতু দাদু, ফুলকো লুচি ফুটো করে, তার মধ্যে ভেলি গুড় ঢুকিয়ে পুরোটা মুখে পুরে চোখ বন্ধ করে চুপ করে বসে থাকে। মনে হয়, যেন অমৃত খেয়েছেন। গোটা কুড়ি খাওয়ার পর আবার সাদা আলুর ঝাল ঝাল তরকারি দিয়ে আরও গোটা কুড়ি!  মা অবশ্য তরকারিটা যা রাঁধে না! একে বারে ফাটাফাটি।
তারপর ফিলটার্ড কফি , গোটা ৪ কাপ মত খেয়ে, বুঁদ হয়ে বসে থেকে বারান্দায় গিয়ে একটা দামী সিগারেট ধরিয়ে মৌতাতটা উপভোগ করেন।
পিন্টু ক্ষেতু দাদুর সিগারেট খাওয়াটা পছন্দ করে না ! চারিদিকে, সিগারেট খাওয়া নিয়ে এত সচেতন করার চেষ্টা চলছে, তাও এগুলো কি দাদু মানতে চায় না?
জিজ্ঞেস করেছিল পিন্টু । উত্তর এসেছিল- বুঝলি পিন্টু, আমি জানি, সিগারেট খাওয়াটা ঠিক নয়, তবুও মনে হয় এটা না খেলে বুদ্ধি খোলে না ! তাছাড়া, এই হাত দুটো নিয়ে যে কি করবো ভেবে পাই না । তাছাড়া, তোর হিরো, ফেলুদা তো সিগারেট খায় । তাও কড়া চারমিনার । আজকাল ফেলু মিত্তির, কি খায় কে জানে? ওটা তো আর পাওয়া যায় না !
বাবা হেসে বলেছিল- ওই জন্যই ফেলুদা সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে, জানেন না? দাদু, মুচকী হাসিটা ঠোঁটে ঝুলিয়ে রাখে ।
মা, ঘরের মধ্যে সিগারেট খাওয়াটা একেবারেই পছন্দ করে না । তাই, দাদু বারান্দায় গিয়ে খেয়ে আসে।
আজকের মেনু ছিল হিংয়ের কচুরী আর কষা আলুর দম ! মা, ডিসে করে সেগুলো আনতেই, দাদুর চোখগুলো গোল্লা গোল্লা হয়ে গেল !!!!!
মা, আরও একটা প্লেট দাদুর সামনে রাখতেই মনে হলো, দাদু আনন্দে হার্ট ফেল করবে । প্রায় ফুটবল সাইজের এক একটা রাজভোগ ! সাথে রাবড়ী
দাদু, চোখ বন্ধ করে খেয়েই যেতে লাগল ।
আজ দাদুকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করার ছিল পিন্টুর । জুতসই সময় পাচ্ছে না ।  স্কুলে গাছপালা নিয়ে পড়ানো চলছে ।  সিলেবাসের বাইরেও যে অনেক কিছু জানার থাকে । 
দাদুর সিগারেট খাওয়া শেষ হতেই, পিন্টু আর দেরী করল না !
-       দাদু !
-       বল
-       তুমি জগদীশ বসুর নাম নিশ্চয়ই শুনেছ ?
-       শুনব কি রে ! উনি তো আমার বন্ধু !
-       সে কি? উনি কবেএ মারা গেছেন, তোমার বন্ধু হবেন কি করে?
-       এই দ্যাখো ! বলি, ওনার বই তো পড়ি, না কি? সেই হিসেবেই আমার বন্ধু ! যেমন তোপসে, জটায়ু, ফেলুদা, প্রফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু- তেমনই রবি ঠাকুর, রাজশেখর বসু-সত্যজিৎ রায়- আরও অনেকে, আমার – তোর- সবার বন্ধু ! এদের তো ভালবাসতে হবে, তাই না ? বুঝলি কিছু?
-       হুম, বুঝলাম !
-       তা, কি বলবি বল !
-       বলছিলাম, গাছের প্রাণ আছে- এটা জগদীশ বসু আবিস্কার করেছিলেন?
-       এই তো! এটা সম্পূর্ণ ভাবে ভুল কথা ! সবাই বলে বটে, তবে এটা ঠিক নয় । গাছের যে প্রাণ আছে সে কথা কিন্তু জগদীশ বোস বলেন নি।  তবে, এটা বলা যেতে পারে তিনি আবিস্কার করেছিলেন নতুন করে ! ইংরেজী তে, ডিসকভারি আর ইনভেনশান এই দুটো কথা আছে । ডিসকভারি হচ্ছে, যে জিনিসটা অচেনা ছিল, তাকে সামনে আনা আর ইনভেনশান হচ্ছে, যেটা ছিলই না, তাকে বের করা । যেমন ইলেকট্রিক বাল্ব, টিভি- এই সব ।  তিনি, ডিসকভার করেছিলেন এটা বলা যেতে পারে, তবে,  ইনভেনশান করেছিলেন এটা বলা যায় না ! তবে, তিনি আচার্য্যদেব অন্য কারণে ।
-       তাই?
-       এজ্ঞে, পিন্টু বাবু- ঠিক তাই ! গাছের প্রাণের কথা বহুদিন ধরেই পণ্ডিতেরা জানেন আর  এটাও সবাই দেখেওছিলেন- গাছ, চারা থেকে আস্তে আস্তে কি করে বেড়ে ওঠে তাই, গাছের যে প্রাণ আছে, সেটা জানাই ছিল । গাছেরা আমাদের মত চলাফেরা করতে পারে না ।
-       তারপর?
-       বলতো, পৃথিবীর প্রাচীনতম গ্রন্থের নাম কি ?
-       প্রাচীনতম গ্রন্থ, কি দাদু?
-       ভুলেই গেছিলাম, তুই ইংলিশ মিডিয়ামে পড়িস ! গ্রন্থ মানে বুক! বই ! পুস্তকও বলা হয় ! আর প্রাচীনতম মানে- ওলডেস্ট- সবচেয়ে পুরোনো !  এবার বল, উত্তরটা ! দেখি, জানিস কিনা!
-       বুঝেছি! ওটার উত্তর- ঋগ্বেদ !
-       রাইট্ । কি করে জানলি?
-       ক্লাস ফাইভের হিস্ট্রিতে পড়ানো হয়েছিল আমাদের ।
-       বেশ, বেশ
এর মধ্যে দাদু, মাকে বললেন – পিঙ্কি, আর এক  কাপ কফি দাও ! তোমার ছেলের প্রশ্নের চোটে আমার বকতে বকতে গলা শুকিয়ে গিয়েছে ।
মা বলল- আনছি, বসুন । তবে আমি না আনা পর্যন্ত আপনি শুরু করবেন না ! আমিও শুনছি কিন্তু ! হেবী ইনটারেস্টিং তো !
কফিটা তারিয়ে তারিয়ে খেলেন দাদু । দাদু, নিজে অংকের ছাত্র ছিলেন, কিন্তু সব বৈজ্ঞানিক ব্যাপারেই খুব আগ্রহী বা ইনটারেষ্টেড্ ।
-       শোন ! বেদেই বলা আছে, প্রাণ চার রকম । অন্ডজ(ডিম থেকে যাদের জন্ম), জীবজ( জীবদেহ থেকে যাদের জন্ম), স্বেদজ( সিক্ততা থেকে যাদের জন্ম), এবং উদ্ভিজ্জ( যা মৃত্তিকা থেকে উদ্ভূত)
-       সব শুনে যে লাট খাচ্ছি !
বাবা এবার মুখ খুলল! এই সব সংস্কৃত শব্দ বললে তো হার্ট ফেল করব মামু! পারো বটে তুমি !
-       রতন, তুই তো একটু আধটু সংস্কৃত পড়েছিলি, তুই একথা বলছিস কেন ?
-       সে তো ক্লাস এইট অব্দি ! অতটুকু পড়ে কি আর সব বোঝা যায় ! আমার তো উচ্চারণ করতে গেলেই দাঁত খুলে পড়ে যাবে । তবে, অণ্ডটা বুঝলাম । মানে হল – ডিম বা এগ্ ।
-       আর জীবজ? একটু যেন বুঝতে পারছি । মায়ের প্রশ্ন ।
-       তালে, পরিস্কার করেই বলি, কেমন?
-       হ্যাঁ ! হ্যাঁ! সেটাই বরঞ্চ ভালো ! উরি বাবা ! বাবা হেসে বলল।
-       ডিম থেকে প্রাণের জন্ম তো বুঝলি, যেমন পাখি।  জীবজ মানে যে কোন জীবের থেকে , মানে মানুষ, বাঘ এইসব । স্বেদ মানে ঘাম । এদের থেকে নানারকম জীবাণু বা ব্যাক্টেরিয়া । সিক্ত মানে ভিজে । আর মৃত্তিকা মানে মাটী । উদ্ভিদ, মানে মাটী ভেদ বা ফুটো করে যেটা ওঠে । বলি বুঝলি কিছু ?
-       হুম, পিন্টুর উত্তর ।
-       বেদ স্বীকার করে এই চারপ্রকার প্রাণ ই প্রজ্ঞা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মানে হল, বেদ এটা স্বীকার করে, এই চাররকম প্রাণই বুদ্ধি দিয়ে কন্ট্রোলড্  ।
-       প্রজ্ঞা?
-       প্রজ্ঞা কথাটার মানে হল, তীক্ষ্ণমতি বা প্রচণ্ড বুদ্ধি । পাশ্চাত্য বিজ্ঞানে, জগদীশ বোসের বেশ কিছুদিন আগেই চার্লস ডারউইনের কাজ স্বীকৃতি পেয়ে গেছে এবং জীবরাজ্যে উদ্ভিদের স্থান নিয়ে কোনো দ্বিমত তখন আর নেই। এ হল,১৮ শতকের শেষের দিক। অন্যদিকে, জগদীশবাবু যখন উদ্ভিদ বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করতে শুরু করেছেন সে হল ১৯ শতকের গোড়ার দিক। বলা যেতে পারে জগদীশ বোস উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণায় একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিয়ে গিয়েছেন, এবং এখনো সেই দিগন্তে অনেক কিছুই আমাদের অজানা।
-       গবেষণা মানে রিসার্চ, বুঝলি পিন্টু, আর পাশ্চাত্য বিজ্ঞান মানে ওয়ের্ষ্টান সায়েন্স- বাবা বলল।
ক্ষেতু দাদু, এবার উঠে বারান্দায় সিগারেট ধরাতে গেলেন । পিন্টু মুগ্ধ হয়ে শুনছিল ।  মা, বাবাকে বলল:- এবারে মামু যখন বলবে, তখন আর বাধা দিও না । উনি বলে যান, তারপর যদি কিছু জানার থাকে, আমরা জেনে নেব । বার বার বাধা দিলে উনি ঠিক ভাবে বলতে পারছেন না ।
ক্ষেতু দাদু ফিরে এসে শুরু করলেন :-
জগদীশ বোসের উদ্ভিদবিজ্ঞানের গবেষণা শুরু হয়েছিল জড় ও জীবজগতের মধ্যে কোথায় সীমারেখা টানা যায় তার সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে গিয়ে। ১৯০২ সালে প্রকাশিত তাঁর বই “Response in the Living and Non-living” তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন জড় পদার্থ, যেমন পাথর বা ধাতু কে বৈদ্যুতিক উত্তেজনা সরবরাহ করলে, শুধু যে তারা সাড়া দেয় তা নয়, সেই সাড়ার ধর্মে ক্লান্তি, উৎসাহ ইত্যাদি জীবসুলভ সমস্ত ওঠানামাই দেখা যায় এবং তা মাপাও সম্ভব। পেশীর সংবেদনশীলতা ও জড় পদার্থের এই electrical response curve কে না বলে দিলে, আলাদা করে বুঝে নেওয়া সম্ভব নয়। জগদীশ বোস ছিলেন ইউরোপিয়ান reductionist মতবাদের একজন পথিকৃৎ, যদিও তিনি নিজে তা তত বোঝেন নি, পৃথিবীর মূল বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্র গুলো থেকে ভারতবর্ষ বহুদূরে সরে থাকার জন্য। তাঁর ফিলোজফি, তাঁর বিজ্ঞান সাধনাকে বহুলাংশে একপেশে করে দিয়েছিল, কারণ তিনি চেষ্টা করেছিলেন একটা unified manner of response  খুঁজতে,- সেটা  জড়েই হোক বা প্রাণীকুলে বা উদ্ভিদেই হোক। কিন্তু সেই পথে এগিয়েই তিনি দেখিয়েছিলেন, যে পতংগভুক গাছ, কি লজ্জাবতী গাছ, যে সব গাছ কে তখন পর্যন্ত special case হিসাবে দেখা হত, কারণ তাদের বাইরের উত্তেজনায় সাড়া দেওয়া আমরা চোখে দেখতে পাই, এ ছাড়াও অন্যান্য গাছেরাও একই ভাবে সাড়া দেয়। তাদের সাড়া দেওয়া আমরা চোখে না দেখতে পেলেও তা electrical potential wave হিসাবে মাপা সম্ভব। এই measurement করে দেখিয়ে তিনি দাবি করেন যে প্রতিটি উদ্ভিদ ই excitable এবং প্রাণীকুলের সংগে তাদের excitability র সাদৃশ্য দেখে বলা যায় যে উত্তেজনায় প্রাণী বা উদ্ভিদ একই ভাবে respond করে। এই থিওরির প্রচুর সমালোচনা ত হয় ই, উপরন্তু, ১৯০১ সালে রয়াল সোসাইটি তে আরকাইভ করা বোসের পেপারের মূল বক্তব্য, A. Waller, নামে এক তৎকালীন নামকরা উদ্ভিদবিজ্ঞানী- নিজের মত করে ছেপে দেন, এবং তার পরে, পর পর উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা নিয়ে পাঁচটি পেপার রয়াল সোসাইটি ছাপতে অস্বীকার করে।
সেগুলি মনোগ্রাফ হিসেবে ছাপা হয় এবং প্রত্যেকটি কাজই আজ প্রমাণিত।
একটানা বলে, ক্ষেতু দাদু দম নেবার জন্য থামলেন । সাধনা মাসী ট্রে তে করে কফি নিয়ে হাজির হলে, মা সেটা পট থেকে ঢেলে, কাপে করে দিলেন দাদুর সামনে ।
দাদু বললেন- সব না হয় বলছি, কিন্তু আজ দুপুরের মেনু কি?
মা বলল:- দেরাদুন রাইস
ইলিশ মাছের ভাপা
কচুর শাক দিয়ে ইলিশের মাথা
আর শেষ পাতে জনাইয়ের মনোহরা ।
দাদু, চোখ বন্ধ করে চুপ করে থেকে বলল:- ওই কচুর শাকের ওপর একটু কাঁচা সরষের তেল ছড়িয়ে দিবি তো পিঙ্কি ! খ্যাঁট টা যা জমবে না! আহা !
পিন্টু বলল:- নাও এবার আবার শুরু কর। আমি কিন্তু সব কিছুর নোট নিচ্ছি ।
দাদু শুরু করলেন :-
গাছের নার্ভাস সিস্টেম, যোগাযোগ করার ক্ষমতা, এবং স্বতন্ত্র ও উন্নত জীব হিসাবে স্বীকৃতি।এইসব উদ্ভিদ বিবর্তনের ইতিহাসে ততটাই উন্নত, যতটা মানুষ, এই নিয়ে এখনো বিতর্ক তুঙ্গেএখন আমরা জানি যে গাছের নিজস্ব কমিউনিকেশন সিস্টেম আছে। মূল দিয়ে মাটি থেকে জীবনের উপাদানগুলি শুষে সে নিজের খাবার বানায়, সূর্য অস্ত গেলে তারও ঘুমের সময় হয়, আমাদের ই মত তার শ্বাস প্রশ্বাসের আণবিক রহস্য, বৃদ্ধির পদ্ধতি। প্রশ্ন, উদ্ভিদের মস্তিষ্ক নেই , নেই নার্ভ্ তন্ত্র, এই অবস্থায় কি তাকে বলা চলে সত্যি উন্নত? অথবা, অন্য কথায়, উদ্ভিদের ভিন্ন গঠনের যোগাযোগ তন্ত্র কে কি বলা চলে নার্ভাস সিস্টেম”? এ নিয়ে বিজ্ঞান এখনো ধন্দে। উদ্ভিদের মূল যোগাযোগতন্ত্র টি কেমিক্যাল। ঊর্দ্ধগামী মাটি থেকে শুষে নেওয়া জল, যাতে মিশে আছে বিভিন্ন রাসায়নিক সিগন্যাল, বয়ে চলে মৃত জাইলেম নলের ভিতর দিয়ে। যেতে যেতেই সেই খবর সে ছড়িয়ে দিয়ে যায়, হাজারো রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু করার জন্য। কখনো সে খবর বলে মাটিতে মিশে রয়েছে অতিরিক্ত নুন, বা নেই প্রয়োজনীয় জল বা খাবারের উপাদান। সেই অনুযায়ী প্রতিটি কোষ নিয়ন্ত্রণ করে তার আভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া। আবার পাতায় পৌঁছে, খাবার তৈরি হয়, আলোর উনুনে, আর সেই খাবার ফ্লোয়েম নলের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে যায় গাছের শরীরে। পোকামাকড় বা জীবাণুর আক্রমণে আপৎকালীন তৎপরতাও দেখা যায়। এমন কি ছুঁলে লজ্জা পায় গাছ, বারবার ছুঁলে, সেই গাছ ঠিক্ঠাক বাড়ে না। হাজারো আগাছার মধ্য থেকে নিজের প্রজাতিকে চিনে সাহায্যের হাত ও বাড়িয়ে দিতে পারে, যাকে বলে kin selection. নিজের বাচ্চাকে ঠিক চিনে নিতে পারে প্রতিটি জীব । এই এত রকম সচেতন সিদ্ধান্ত যে নিতে পারে, যার adaptability প্রশ্নাতীত, তার বুদ্ধিমত্তা নেই বলা কি ঠিক?
এর উত্তর দিতে গিয়ে আমাদের redefine করতে হচ্ছে মস্তিষ্ক ও বুদ্ধির সংজ্ঞা। উদ্ভিদ বিজ্ঞানে এটি এখন Hot topic, বিভিন্ন দিক থেকে চলছে, স্নায়ুতন্ত্রের মত কিছু একটা structural form পতঙ্গভুক বা ওই রকম গাছে খুঁজে বার করার চেষ্টা। বিরোধীরা বলছেন, নো ব্রেন, নো গেইন। অর্থাৎ যতক্ষণ না ঐ বুদ্ধির ভরকেন্দ্রটিকে দেখা যাচ্ছে ততক্ষন কোষস্থিত বুদ্ধিমত্তা কে তাঁরা মানবেন না।
অর্থাৎ, এই  একবিংশ শতাব্দীতেও আচার্য্যদেব হেড্ লাইনে। এখানেই আমরা জগদীশ বোসের কাছে মাথা নত করি ! ভাবতেও অবাক লাগে, সেই সময়ে এই সব আবিস্কার এবং তর্ক বিতর্কের শুরু করে দিয়েছিলেন । বুঝলি পিন্টু???
আর ঠিক এই জন্যেই আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বসু আমাদের সকলের বন্ধু।
পিন্টু মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল :- মা আস্তে আস্তে একটা গাছ হয়ে, ডাল নাড়িয়ে তার দিকে হাত বাড়িয়ে বলছে :- পিন্টুউউ, খেতে আয়য়য়য়য়য়য়য়য়য়!
(সমাপ্ত)
=
তথ্যের জন্য কৃতজ্ঞতা :- সোনালী সেনগুপ্ত ( গবেষিকা)